কবির হোসেন, আলফাডাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি
প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কেউ নিজেকে গুটিয়ে নেন, কেউবা হারিয়ে যান জীবনের নানা ব্যস্ততায়। তবে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার হাদী বাবুল আক্তার বাবলুর গল্পটা একটু ভিন্ন। অপূর্ণ প্রেমের স্মৃতিকে সঙ্গী করে তিনি হাতে তুলে নিয়েছেন বাঁশি। সেই বাঁশির সুরেই কেটে গেছে জীবনের প্রায় ২৫ বছর।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে আলফাডাঙ্গা হাসপাতাল রোডের জননী ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে বাঁশির সুরে উপস্থিত মানুষকে মাতিয়ে রাখেন বাবলু। তাঁর বাঁশির সুর শুনতে আশপাশের লোকজন জড়ো হন। পরিচিত বিভিন্ন গানের সুর তুলে কিছু সময়ের জন্য দর্শকদের আনন্দ দেন তিনি।
আলফাডাঙ্গা উপজেলার বানা ইউনিয়নের রুদ্রবানা গ্রামের হাদী আতিউর রহমানের ছেলে বাবলু। এলাকায় তিনি ‘বাঁশি বাবলু’ নামেই বেশি পরিচিত। এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন তিনি। জীবিকার তাগিদে দর্জির কাজ ও কৃষিকাজ করেন। পাশাপাশি ফুটবল খেলেন এবং শখের ‘দাবুড়ে’ ঘোড়া নিয়ে বিভিন্ন ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায়ও অংশ নেন।
তবে এসব পরিচয়ের আড়ালে বাবলুর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি একজন বংশীবাদক। প্রায় ২৫ বছর ধরে বাঁশি বাজিয়ে আসছেন তিনি। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বাঁশি তাঁর নিত্যসঙ্গী। সাইকেলে পথে বের হলে পরিচিত-অপরিচিত অনেকেই তাঁকে থামিয়ে বাঁশি বাজানোর আবদার করেন। বিনা পারিশ্রমিকেই তাঁদের সেই আবদার পূরণ করেন বাবলু।
রাস্তার মোড়, হাট-বাজার, নদীর পাড় কিংবা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান—সুযোগ পেলেই বাঁশিতে সুর তোলেন তিনি। তাঁর সুরে আকৃষ্ট হয়ে পথচারীরাও অনেক সময় দাঁড়িয়ে যান কিছুক্ষণের জন্য।
বাবলু বলেন, ‘ওস্তাদ মনা মিয়া, জিতেন ঘোষ ও ওস্তাদ কায়েমের কাছ থেকে বাঁশি বাজানো শিখেছি। প্রায় ২৫ বছর ধরে বাঁশির সুরে মানুষকে আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করছি। ২৪ ঘণ্টাই বাঁশি আমার সঙ্গে থাকে। সুযোগ পেলেই সুর তুলি।’
নিজের জীবনের গল্প বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কলেজজীবনে প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার পর বাঁশির সুরের মাঝেই নিজেকে সঁপে দিয়েছি। এখন মানুষের আনন্দের জন্য বাকি জীবন কাটাতে চাই। রেডিও, টেলিভিশন কিংবা চলচ্চিত্রে বাঁশি বাজানোর সুযোগ পাওয়া আমার স্বপ্ন।’
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম ছিরু বলেন, ‘মাথায় লম্বা চুল আর বাঁশির সুর—দুটিই বাবলুকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। এ অঞ্চলে তাঁর বাঁশির সুর শোনেননি, এমন মানুষ খুব কম।’
আলফাডাঙ্গা সরকারি কলেজের প্রভাষক ও পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি প্রবীর কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘বাঁশি বাংলা সংস্কৃতির প্রাচীন বাদ্যযন্ত্রগুলোর একটি। বাবলু দীর্ঘদিন ধরে গ্রাম, হাট-বাজার ও পথে পথে বাঁশির সুর ছড়িয়ে লোকজ ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।’
বাবলুর কাছে এখন বাঁশিই সবচেয়ে আপন। সাইকেলে পথে বের হলে কাঁধে থাকে বাঁশি। চারপাশে সুযোগ পেলেই তাতে সুর তোলেন তিনি। সেই সুরে কখনো আনন্দ খোঁজেন, কখনো হয়তো ফিরে যান পুরোনো স্মৃতির কাছে। আর নিজের অতীতকে সঙ্গী করেই মানুষকে আনন্দ দিয়ে চলেছেন আলফাডাঙ্গার ‘বাঁশি বাবলু’।

