রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
খুলনার তেরখাদায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) (এসি ল্যান্ড) পরিচয়ে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে ফোন করে অর্থ দাবির অভিযোগ উঠেছে। দোকান সিলগালা ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। ইতোমধ্যে তিনটি ঘটনায় মোট ২ লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করার তথ্য পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) তেরখাদার বিভিন্ন এলাকায় এমন একাধিক ফোনকলের ঘটনা সামনে আসে। স্থানীয় ও ভুক্তভোগী সূত্রের অভিযোগ, শুধু একটি বাজার নয়, উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে একই কায়দায় ফোন করা হচ্ছে। ফোনদাতারা নিজেদের এসিল্যান্ড কিংবা সরকারি কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ভয় দেখানোর পর টাকা পাঠাতে চাপ দিচ্ছেন।
এমন একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে জয়সেনা বাজারের বুলবুল ফার্মেসির প্রোভাইডার রবিউল ইসলামের কাছ থেকে। তাঁর মোবাইল ফোনে কল করে এক ব্যক্তি নিজেকে তেরখাদা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) পরিচয় দেন।
ফোনে রবিউলকে বলা হয়, কাটেঙ্গা বাজারের সালমা মেডিকেল সিলগালা করা হচ্ছে। একইভাবে তাঁর দোকানেও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে সিলগালা করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়।
রবিউল ইসলাম বলেন, ‘ফোনে আমাকে বিকাশের মাধ্যমে ৭০ হাজার টাকা দিতে বলা হয়। টাকা দিলে আমার নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে, আর টাকা না দিলে দোকান সিলগালা করা হবে বলে জানানো হয়। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় আমি টাকা দিইনি।’
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, কাটেঙ্গা বাজারের সালমা মেডিকেলের কাছে ১ লাখ টাকা এবং মল্লিক মেডিকেলের কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে। রবিউল ইসলামের কাছ থেকে চাওয়া ৭০ হাজার টাকাসহ তিনটি ঘটনায় মোট ২ লাখ ২০ হাজার টাকা দাবির তথ্য পাওয়া গেছে।
অর্থ দাবির ফোনকলের আগে ব্যবসায়ীদের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টার অভিযোগও পাওয়া গেছে। তেরখাদা সদর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের চৌকিদার অনুপম সাহা শুভর কাছে এসিল্যান্ডের পরিচয়ে ফোন করে সদর ইউনিয়নের বাজারে থাকা ফার্মেসি, সার ও ওষুধের দোকানের তালিকা এবং মালিকদের মোবাইল নম্বর চাওয়া হয়।
অনুপম সাহা শুভ জানান, ফোনদাতা নিজেকে এসিল্যান্ড পরিচয় দিয়ে এসব তথ্য চান। পরে তিনি বাজারের দোকানগুলো দেখিয়ে দেন এবং দোকানমালিকদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে দেন। সরকারি কর্মকর্তার পরিচয়ে তথ্য চাওয়া হওয়ায় তিনি বিষয়টিকে স্বাভাবিক সরকারি কাজ হিসেবেই নিয়েছিলেন বলে জানান।
সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এফ এম ওহিদুজ্জামান বলেন, ‘এসিল্যান্ডের পরিচয়ে অনুপম সাহা শুভর কাছে বাজারের ফার্মেসি ও অন্যান্য দোকানের তথ্য এবং ব্যবসায়ীদের মোবাইল নম্বর চাওয়া হয়েছিল। পরে অনুপম সেগুলো সংগ্রহ করে দেন।’
তবে এসব তথ্য পরে কার কাছে বা কীভাবে পৌঁছেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর কীভাবে প্রতারকদের হাতে গেল, সেটি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে অনুপম সাহা শুভর ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন তারা। তবে প্রতারণা চক্রের সঙ্গে অনুপম সাহা শুভ জড়িত—এমন কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তিনি কীভাবে, কার নির্দেশে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন এবং ওই তথ্য পরে কোথায় গেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
তেরখাদা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম নুরুন্নবী বলেন, ‘এসি ল্যান্ড কিংবা কোনো সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তার পক্ষ থেকে কোনো ধরনের চাঁদা বা অর্থ দাবি করা হচ্ছে না। কেউ এ ধরনের ফোন পেলে এটিকে প্রতারণা হিসেবে ধরে নিয়ে কোনো অর্থ প্রদান করবেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তার পরিচয়ে কেউ অর্থ দাবি করলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অফিসিয়াল নম্বরে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হবে।’
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সরকারি কর্মকর্তার পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ দাবির বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তেরখাদার বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে একই ধরনের ফোন করার অভিযোগ থাকায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারি কর্মকর্তার নাম-পদবি ব্যবহার করে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা বন্ধের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে প্রতারকদের হাতে যাচ্ছে, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ী, প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সাধারণ নাগরিকদের অপরিচিত নম্বর থেকে আসা এ ধরনের ফোনকলে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকারি কোনো দপ্তরের নামে অর্থ দাবি করা হলে যাচাই ছাড়া টাকা না দিয়ে সরাসরি সংশ্লিষ্ট সরকারি কার্যালয়ে যোগাযোগ করে সত্যতা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

