খুলনা প্রতিনিধি
ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার প্রায় অর্ধশত যুবকের কাছ থেকে প্রায় ২ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ‘জিসান ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। সার্বিয়া ও ডেনমার্কে চাকরির আশ্বাস দিয়ে টাকা নেওয়ার পর ভিসা, বিমান টিকিট ও জনশক্তি সংক্রান্ত কাগজপত্র দেওয়া হলেও পরে সেগুলো ভুয়া বলে জানতে পারেন ভুক্তভোগীরা। এরই মধ্যে গত ৭ আগস্ট অফিস গুটিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে প্রতিষ্ঠানের মালিক মোহাম্মদ ফিরোজ রাশেদ ওরফে জিসান আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
খুলনা নগরের তেঁতুলতলা মোড়ের ডাচ্-বাংলা ভবনের ওপরের তলায় ছিল প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সেখানে বসেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হতো। বিদেশে পাঠানোর আগে ঢাকায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে বলেও তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল।
ভুক্তভোগীরা জানান, টাকা নেওয়ার সময় নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তিপত্র, ভিসা, বিমান টিকিট ও জনশক্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন কাগজপত্র দেওয়া হয়। তবে পরবর্তী সময়ে এসব নথির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
খুলনার নিউ রাস্তা এলাকার বাসিন্দা আরমান পেশায় ব্যক্তিগত গাড়িচালক। তার অভিযোগ, দ্রুত সার্বিয়ায় পাঠানোর কথা বলে তার কাছ থেকে টাকা নেন শিলা খানম। পরে তাকে ভিসা ও জনশক্তি সংক্রান্ত কাগজপত্র দেওয়া হলেও যাচাই করতে গিয়ে সেগুলো ভুয়া বলে জানতে পারেন তিনি।
ভুক্তভোগী হাসানুর রহমানের অভিযোগ, কয়েকজন মিলে সার্বিয়ায় যাওয়ার জন্য প্রায় ১৪ লাখ টাকা দেন। তাদের প্রত্যেককে সার্বিয়ার ভিসা ও বিমান টিকিট দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত ফ্লাইটের আগের দিন পর্যন্ত জিসান ও শিলার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল। কিন্তু ফ্লাইটের সময় ঘনিয়ে আসার আগেই তারা অফিস বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান।
হাসানুর রহমান বলেন, বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে তারা ঢাকায় গিয়ে কাগজপত্রসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যাচাই করেন। তখন তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হন বলে দাবি করেন তিনি।
শেখপাড়া এলাকার বাসিন্দা কুমকুম বেগম জানান, জিসান ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজমের অফিসটি তার বাসার পাশেই ছিল। পরিচিতির সূত্রে তাদের ওপর আস্থা তৈরি হয়। পরে তার স্বামীকে ডেনমার্কে পাঠানোর জন্য ১০ লাখ টাকায় চুক্তি করেন। কয়েক দফায় টাকা দেওয়ার পর হঠাৎ অফিস বন্ধ করে জিসান ও শিলা এলাকা ছেড়ে চলে যান বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জিসানের বিরুদ্ধে আগের কয়েকটি মামলায় পাঁচটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল বলে জানা গেছে। প্রতারণার অভিযোগ ওঠার পর তিনি দালালের মাধ্যমে ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে।
অন্যদিকে, গত ৭ আগস্ট চুয়াডাঙ্গার জীবননগর সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে যাওয়ার সময় শিলা খানমকে আটক করা হয় বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় জীবননগর থানায় পৃথক একটি মামলা হয়েছে।
স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, শিলার কাছ থেকে ভুক্তভোগীদের কিছু টাকা উদ্ধার করা হয়েছিল। পরে বাকি টাকা পরিশোধের আশ্বাস দেওয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর তিনিও আত্মগোপনে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের পক্ষে খুলনা জজ কোর্টের আইনজীবী মো. মনিরুল ইসলাম পান্না আদালতে একটি অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আদালত অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণের জন্য সোনাডাঙ্গা মডেল থানাকে নির্দেশ দেন।
সোনাডাঙ্গা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশে নিয়মিত মামলা করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তার এবং ভুক্তভোগীদের টাকা উদ্ধারে পুলিশ কাজ করছে।
এদিকে জিসান ও শিলা খানমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ইউরোপে যাওয়ার আশায় কেউ জমি বিক্রি করে, কেউ ধারদেনা করে আবার কেউ পরিবারের সঞ্চয় ভেঙে টাকা দিয়েছেন। বিদেশে গিয়ে পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার স্বপ্ন দেখলেও এখন উল্টো ঋণের বোঝা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।

