যশোর প্রতিনিধি
সড়ক আছে, যানবাহন আছে, মানুষ আছে—কিন্তু নেই শৃঙ্খলা। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহর যশোর দিন দিন কার্যত অচল শহরে পরিণত হচ্ছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কে তীব্র যানজটে থমকে যাচ্ছে নাগরিক জীবন। অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচল, দুর্বল তদারকি এবং প্রশাসনিক শিথিলতার পাশাপাশি নতুন করে ফিলিং স্টেশনকেন্দ্রিক দীর্ঘ গাড়ির সারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
শহরের প্রাণকেন্দ্র দড়াটানা মোড়ে দেখা যায়, মেসার্স তোফাজ্জেল হোসেন ফিলিং স্টেশনের সামনে জ্বালানি নিতে আসা মোটরসাইকেলের লাইন অনেক সময় পূর্বে চিত্রা মোড় এবং পশ্চিমে দড়াটানা মোড় পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায়। এতে সড়কের বড় অংশ দখল হয়ে সংকুচিত হয়ে পড়ে যান চলাচল। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থবির হয়ে থাকে এ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক।
একই চিত্র মণিহার এলাকার যাত্রীক ফিলিং স্টেশনেও। বাস, ট্রাক ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন রবীন্দ্রনাথ সড়কের বড় অংশ জুড়ে থাকায় আশপাশের সড়কেও ছড়িয়ে পড়ছে যানজট। খাজুরা বাসস্ট্যান্ড, পুরাতন খয়েরতলা, ধর্মতলা মোড়, চাঁচড়া মোড় থেকে আকিজ ফিলিং স্টেশন পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
নাগরিকদের অভিযোগ, প্রতিদিন যানজটের কারণে কর্মঘণ্টার বড় অংশ নষ্ট হচ্ছে। কেউ সময়মতো অফিস-আদালতে পৌঁছাতে পারছেন না, আবার জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে যেতেও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শুধু জ্বালানি নিতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের।
তবে সংকট শুধু ফিলিং স্টেশনেই সীমাবদ্ধ নয়। শহরের প্রধান সড়কগুলো এখন ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, অটোরিকশা ও নিয়ন্ত্রণহীন মোটরসাইকেলের দখলে। যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো, সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের কারণে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। দড়াটানা, মণিহার, খাজুরা বাসস্ট্যান্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে একসঙ্গে ২০-২৫টি ইজিবাইক দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য এখন নিত্যদিনের।
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, শহরে বৈধ ইজিবাইক প্রায় সাড়ে চার হাজার, রিকশা ২ হাজার ৯৭৩টি এবং ভ্যান ২৯৩টি—মোট প্রায় ৭ হাজার ৭৬৮টি যানবাহন রয়েছে। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা। আশপাশের এলাকা থেকে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক ইজিবাইক শহরে প্রবেশ করায় নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক বিভাগ।
শহরের দড়াটানা মোড়, হাসপাতাল মোড়, কোর্ট মোড়, বড়বাজার, ঘোপ, বকুলতলা, জিরো পয়েন্ট, চিত্রা মোড় থেকে মণিহার পর্যন্ত প্রতিদিন একাধিকবার তীব্র যানজট তৈরি হচ্ছে। এতে শহরে প্রবেশ ও বের হওয়া ক্রমেই দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে।
পালবাড়ি এলাকার বাসিন্দা রিয়াজুল ইসলাম শাওন বলেন, “এই শহরে বের হওয়া এখন মানসিক যন্ত্রণার মতো। দশ মিনিটের রাস্তা যেতে এক ঘণ্টা লেগে যায়।” পোস্ট অফিসপাড়ার গৃহিণী সুমি বেগম বলেন, “বাচ্চাকে স্কুলে নিতে গিয়ে প্রতিদিন যুদ্ধ করতে হয়। অ্যাম্বুলেন্সও আটকে থাকে।”
রিকশাচালক তবিবুর রহমান বলেন, “আমরাও কষ্ট পাই। কোনো নিয়ম নেই, সবাই যেভাবে পারে চলে।” সমাজকর্মী সজীব হাসান মনে করেন, “এটা শুধু যানজট নয়, অর্থনৈতিক ক্ষতিও। প্রতিদিন বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।”
এদিকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ট্রাফিক পুলিশের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জনবল সংকট ও নানা সীমাবদ্ধতায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
জেলা ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ এস এম ইউসুফ আলী জানান, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরকে সামনে রেখে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়া হচ্ছে। সফরের পর পৌরসভাকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর অভিযান চালানো হবে।
পৌরসভার প্রশাসক (উপ-সচিব) রফিকুল হাসান বলেন, অবৈধ ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড নির্ধারণে কাজ চলছে।
নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সমন্বয়ক শেখ মাসুদুজ্জামান মিঠু বলেন, “ইজিবাইক চালকেরা জীবিকার তাগিদে এ পেশায় এসেছেন। তাদের হয় সুনির্দিষ্ট পরিচয়ের আওতায় আনতে হবে, না হলে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইনের শিথিল প্রয়োগের কারণেই যশোর শহরে এ ভয়াবহ যানজট পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন তারা।

