দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নিয়ন্ত্রণাধীন ক্যানাল, সরকারি খাল ও জমিসহ বিভিন্ন স্থান থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলন ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একাধিকবার অবহিত করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় চক্রটি দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন রাত ৯টার পর শুরু হয় মাটি কাটার কার্যক্রম, যা চলে ভোররাত পর্যন্ত। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে এ তৎপরতা বেড়ে যায়। স্কেভেটর ও শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ট্রলির মাধ্যমে কাটা মাটি বিভিন্ন ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের বাহিরমাদী টোলপাড়া এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যানাল থেকে গভীর গর্ত করে মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বর্ষা ও বন্যা মৌসুমে এভাবে মাটি কাটা অব্যাহত থাকলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও সংযোগ সড়ক মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সম্পত্তি থেকে অবৈধভাবে মাটি কেটে বিক্রি করছে। এ কাজে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও দাবি করেন তারা। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি রাতে প্রায় এক হাজার ট্রলি মাটি বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, প্রশাসন ও পুলিশকে বারবার বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে সরকারি সম্পদ অবাধে লুটপাট হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে বানাত ব্যাপারী প্রথমে দাবি করেন, তিনি নিজের জমির মাটি কাটছেন। তবে রাতের বেলায় মাটি কাটার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, অন্যরা মাটি কাটছে। এ বিষয়ে তিনি সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
ফিলিপনগর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান একরামুল হক বলেন, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র ক্যানালের মাটি কেটে বিক্রি করছে বলে শুনেছি। তারা প্রভাবশালী হওয়ায় অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পায়। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হবে।
এদিকে সরকারি সম্পত্তি রক্ষার স্বার্থে গত বৃহস্পতিবার দৌলতপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। পাউবোর কার্যসহকারী শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে অভিযোগটি করেন। তবে অভিযোগের পরও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, অভিযোগটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অবৈধ মাটি কাটা বন্ধে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, “আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। কিন্তু মাটি কাটা চক্রগুলো বেশিরভাগ সময় রাতের বেলায় কাজ করে। অনেক সময় অভিযানে গিয়ে তাদের পাওয়া যায় না। পুরোপুরি মাটি কাটা বন্ধ করতে হলে বৃষ্টিরও প্রয়োজন রয়েছে।”
তবে ইউএনও’র এ বক্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রশ্ন, প্রশাসনের আইন প্রয়োগ যদি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে সরকারি সম্পদ রক্ষা করবে কে?
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্যানাল, খাল ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ থেকে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলন শুধু পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়, এটি জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। তাই অবিলম্বে অবৈধ মাটি কাটা বন্ধ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

