যশোর প্রতিনিধি
শিক্ষিত বেকারদের মতো চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকেই জীবনের অবলম্বন হিসেবে বেছে নিয়েছেন যশোর সদর উপজেলার ইছালী ইউনিয়নের কায়েতখালী গ্রামের নারী উদ্যোক্তা নাদিরা সুলতানা। বিএ পাস করা এই নারী কৃষক আজ টমেটো, তরমুজ, ভুট্টা, আলু, মাছ ও বিভিন্ন সবজি চাষের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। তার সাফল্য এখন এলাকার অনেক নারী-পুরুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
সম্প্রতি নাদিরা সুলতানার টমেটো ক্ষেত পরিদর্শন করে দেখা যায়, থোকায় থোকায় ঝুলছে লাল-সবুজ রঙের টমেটো। বাড়ির আঙিনায় স্থাপিত পলিহাউসে বারি-৮ ও মিন্টু সুপার-৩০ এবং ৩৮ জাতের টমেটো চাষ করে তিনি পেয়েছেন ব্যাপক সফলতা।
নাদিরা সুলতানা জানান, চলতি মৌসুমে প্রায় দুই বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছেন তিনি। প্রতিদিন গড়ে তিন মণ টমেটো সংগ্রহ করে বাজারজাত করছেন। বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি মণ টমেটো ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ পর্যন্ত টমেটো বিক্রি করে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা আয় করেছেন, যেখানে তার মোট উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, “২০১১ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করি। প্রথমবার এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করে লোকসান হয়েছিল। তবে হাল ছাড়িনি। ধীরে ধীরে বিভিন্ন ফসল ও মাছ চাষে যুক্ত হয়ে আজ সফলতা পেয়েছি।”
কৃষিকাজ থেকে অর্জিত আয়ে তিনি প্রায় ১৫ লাখ টাকার জমি, ৩৪ লাখ টাকার একটি গাড়ি এবং বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র কিনেছেন। পাশাপাশি মেয়ের উচ্চশিক্ষার ব্যয়ও বহন করছেন। তিনি মনে করেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে কৃষিতে সফলতা অর্জন সম্ভব।
নাদিরা বলেন, “পলিহাউস ব্যবহারের ফলে অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার ক্ষতি থেকে ফসল রক্ষা করা যায়। কারও যদি ১০ শতক জমিও থাকে, সেখানেও টমেটো চাষ করে লাভবান হওয়া সম্ভব।”
তার এই অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৭ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর হাত থেকে ‘ক্রেস্ট অব মেরিট’ লাভ করেন। এছাড়া ২০১৯ সালে যশোর সদর উপজেলা কৃষি অফিসের সেরা কৃষক পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা অর্জন করেছেন। ২০২৪ সালে বঙ্গমাতা কৃষি পুরস্কারের জন্যও মনোনীত হয়েছিলেন তিনি।
নাদিরার স্বামী, অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট সোজাউদ্দৌলা কলিম বলেন, “আমরা তরমুজের ক্ষেতে সাথী ফসল হিসেবে টমেটো চাষ করেছি। পরিকল্পিত চাষাবাদ এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে চলার কারণেই ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে।”
ইছালী ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জহির রায়হান বলেন, “নাদিরা সুলতানা একজন পরিশ্রমী ও সফল নারী কৃষক। তার উৎপাদিত টমেটো নিরাপদ ও সুস্বাদু। তাকে দেখে এলাকার বেকার নারী-পুরুষ কৃষিকাজে আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সবসময় কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।”
নাদিরা সুলতানার সাফল্যের গল্প প্রমাণ করে, কৃষি শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি হতে পারে অর্থনৈতিক মুক্তি ও আত্মপ্রতিষ্ঠার শক্তিশালী হাতিয়ার। তার মতো আরও অনেক নারী কৃষি উদ্যোক্তা গড়ে উঠুক দেশের প্রতিটি গ্রামে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

