দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় চরাঞ্চলের পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি আরও ৩ সেন্টিমিটার বেড়েছে। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে গোখাদ্যের সংকট ও সাপের উপদ্রব। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির সংকটেও পড়েছেন বানভাসী মানুষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি ৩ সেন্টিমিটার বেড়েছে। বর্তমানে ওই পয়েন্টে বিপদসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। সেখানে বিপদসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার।
গত এক সপ্তাহ ধরে পদ্মার পানি অস্বাভাবিকভাবে বাড়ায় সীমান্তবর্তী দৌলতপুর উপজেলার চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। দুই ইউনিয়নের প্রায় ৪০টি গ্রামের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে যোগাযোগের সড়ক ও বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি।
কোথাও কোথাও বাড়ির উঠান ও ঘরের ভেতরে হাঁটুপানি জমেছে। অনেকে ঘরের ভেতর মাচা তৈরি করে কিংবা টিনের চালায় অবস্থান করছেন। পানিতে চরাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় বৃহস্পতিবার থেকে স্থানীয়ভাবে ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
বন্যাদুর্গত এলাকায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে নানা ধরনের দুর্ভোগ। বিশেষ করে সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন পানিবন্দী মানুষ। একই সঙ্গে গবাদিপশুর জন্য গোখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। বিশুদ্ধ পানির সংকটও তীব্র হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকার পানিবন্দী সোহেল আহমেদ বলেন, ‘প্রায় এক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দী অবস্থায় আছি। বাড়ির উঠানে হাঁটুপানি, ঘরের ভেতরেও পানি। বাইরে বের হওয়ার উপায় নেই। কোথাও যেতে হলে নৌকা বা ডিঙির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। পানি পাড়ি দিয়ে সন্তানরা স্কুলে যেতে পারছে না। সব মিলিয়ে মানবেতর অবস্থার মধ্যে রয়েছি।’
পদ্মার পানি বৃদ্ধির ফলে চরাঞ্চলের প্রায় ৪৭০ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে বিভিন্ন ধরনের ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহানা পারভীন বলেন, ‘গতকালের তুলনায় পদ্মার পানি আরও বেড়েছে। এতে বিভিন্ন ফসলের ক্ষতির পরিমাণও বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় ৪৭০ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে।’
এদিকে পানিবন্দী মানুষের অভিযোগ, পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ভোগ বাড়লেও দুর্গত এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছায়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা অফিস থেকে ছাড় না হওয়ায় এখনো বানভাসী মানুষের মধ্যে বিতরণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, ‘রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ এবং চিলমারী ইউনিয়নের পুরো এলাকা বন্যাকবলিত হয়েছে। দুই ইউনিয়নের ৪০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানিতে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও ফসলের জমি তলিয়ে গেছে। গত বুধবার দুর্গত এলাকায় গিয়ে ৩৫০ পরিবারের মধ্যে শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। নতুন করে আরও ত্রাণের বরাদ্দ পাওয়া গেছে। শিগগিরই তা পানিবন্দী ও দুর্গত মানুষের মধ্যে সরবরাহ করা হবে।’
বানভাসী মানুষের দাবি, দুর্গত এলাকার মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত পর্যাপ্ত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি, গোখাদ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে। পাশাপাশি বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সরকার ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

