মনিরামপুর (যশোর) প্রতিনিধি
বিজয়া দশমী মানেই যশোরের মনিরামপুরের ঢাকুরিয়া অঞ্চলে অন্যরকম আনন্দ। শ্বশুরবাড়ির সম্মান আর ভালোবাসার টানে জামাইদের বড় মাছ কেনার ঐতিহ্য ঘিরে প্রতিবারের মতো এবারও বসেছে ঐতিহ্যবাহী ‘জামাই মেলা’। ১৯৫০ সাল থেকে চলে আসা এ মেলা মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) প্রতাপকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠ ও ঘাটুরিয়া বাজার এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মেলাকে ঘিরে বড় মাছ কেনার ধুম পড়েছে, পাশাপাশি বসেছে নাগরদোলা, মিষ্টির দোকানসহ নানা আয়োজন।
মেলায় ৫ থেকে ১৫ কেজি ওজনের রুই, কাতলা, চিতল, ব্ল্যাক কার্প, পাঙাশ ও সিলভার কার্প মাছ নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। জামাইদের মধ্যে বড় মাছ কেনার এক মধুর প্রতিযোগিতা দেখা যায়। আয়োজকদের দাবি, এক দিনের এ মেলায় প্রায় কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়। মাছ কেনাবেচার পাশাপাশি মেলাটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পারিবারিক বন্ধন, ভালোবাসা ও অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
মেলায় আসা জামাই কিশোর রায় বলেন, “আজ থেকে ১৯ বছর আগে মনিরামপুরের জামাই হয়েছি। সেই থেকে প্রতিবছর ঢাকুরিয়ার জামাই মেলায় আসা আমার জীবনের আনন্দের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এবার সকালে ১ হাজার ৫০ টাকা কেজি দরে ১১ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের একটি কাতলা মাছ কিনেছি। এই মাছ শুধু ওজনে বড় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯ বছরের স্মৃতি, ভালোবাসা ও শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে আত্মিক সম্পর্কের টান।”
ঢাকুরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ তাপস কুমার কুন্ডু বলেন, “এই অঞ্চলের মাটি ও মানুষের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে জামাই মেলা। এটি শুধু মাছ কেনাবেচার বাজার নয়, আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সৌহার্দ্য ও পারিবারিক মেলবন্ধনের এক অনন্য উৎসব।”
ঢাকুরিয়া বণিক সমিতির সভাপতি গাজী আব্দুল হান্নান বলেন, ১৯৫০ সাল থেকে সুনামের সঙ্গে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। জামাইদের মাছ কেনার ঐতিহ্য ধরে রাখতে তাঁরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন। এবারও মেলায় প্রায় কোটি টাকার মাছ বিক্রির আশা করছেন তাঁরা।
মেলার স্মৃতিচারণা করে আশীতিপর বৃদ্ধ অমল ঘোষ বলেন, “ছোটবেলা থেকে এই মেলা দেখে আসছি। আগের মতো আজও যখন দেখি জামাইরা হাসিমুখে বড় বড় মাছ কিনে শ্বশুরবাড়ির দিকে ছুটে চলেছে, তখন বুকটা ভরে যায়। আমাদের এই মেলাই আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের শেকড়।”
খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও ঢাকুরিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আবু সাঈদ বলেন, জামাই মেলা এলাকার গর্ব ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি পারিবারিক বন্ধন, ভালোবাসা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য মিলনমেলা। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে এ লোকঐতিহ্যকে জাতীয় পর্যায়ে আরও পরিচিত করা সম্ভব।
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সম্রাট হোসেন বলেন, ঢাকুরিয়ার এ মেলা গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ। জামাইদের মাছ কেনাকে কেন্দ্র করে মেলাটি পারস্পরিক ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে এবং মেলায় আগত মানুষের নিরাপত্তা ও আনন্দ নিশ্চিত করতে প্রশাসন পাশে রয়েছে।
মেলাকে ঘিরে প্রতাপকাটি মাঠজুড়ে বসেছে নাগরদোলা, মিষ্টির দোকান ও গ্রামীণ নানা আয়োজন। অন্যদিকে জামাইদের বরণ করতে শ্বশুরবাড়িতে চলছে পিঠাপুলিসহ নানা খাবারের প্রস্তুতি। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে ঢাকুরিয়ার জামাই মেলা পরিণত হয়েছে সম্প্রীতি ও ভালোবাসার এক বর্ণিল মিলনমেলায়।

