যশোর প্রতিনিধি
যশোরে সড়ক দুর্ঘটনা যেন থামছেই না। অক্টোবর মাসের প্রথম ২৫ দিনেই জেলার বিভিন্ন সড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২০ জন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৪৩ জন। নিহতদের মধ্যে শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে নারী ও বৃদ্ধও রয়েছেন। একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
পুলিশ, হাসপাতাল ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেল, বাস, ট্রাক, পিকআপ, ইজিবাইক ও ইঞ্জিনচালিত ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনের দুর্ঘটনায় এসব প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তরুণদের মৃত্যুর ঘটনা বেশি আলোচনায় এসেছে। গত ২৩ অক্টোবর যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের নতুনহাটে দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিন তরুণ নিহত হন। এর আগে ১৫ অক্টোবর চৌগাছা-যশোর সড়কের টালিখোলা মোড়ে পিকআপ ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে অয়ন হোসেন (২০) ও মিথিলা খাতুন (১৭) প্রাণ হারান।
এ ছাড়া ২ অক্টোবর চৌগাছায় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে সোলাইমান হোসেন (১৬) নামে এক কিশোর নিহত হয়। ৪ অক্টোবর ফাসতলায় পিকআপের ধাক্কায় প্রাণ যায় স্কুলছাত্র জুবায়ের হোসেনের (১৫)। ৬ অক্টোবর শার্শায় পিকআপ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগলে আরিফ হোসেন (৩০) নামে এক হেলপার নিহত হন।
শিশু ও পরিবারের সদস্যরাও রেহাই পাচ্ছেন না এসব দুর্ঘটনা থেকে। গত ২৫ অক্টোবর মণিরামপুরের রাজগঞ্জে মাছবাহী পিকআপের ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে মৌসুমি বেগম (৩২) ও তার চার বছরের ছেলে আবদুর রহমানের মৃত্যু হয়। ১৯ অক্টোবর ঝিকরগাছার ফুলতলায় ভ্যান ও গরুবোঝাই নসিমনের সংঘর্ষে একই পরিবারের দুই শিশু শোভন (১০) ও দিশা (৩) নিহত হয়। ১০ অক্টোবর সদর উপজেলার কচুয়ায় বাড়ির সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় ভ্যানের ধাক্কায় আহত ছয় বছরের শিশু সাজিদ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
এ ছাড়া ট্রাক, বাস ও অন্যান্য যানবাহনের ধাক্কায় জেলার বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। কোথাও দ্রুতগতি, কোথাও নিয়ন্ত্রণ হারানো, আবার কোথাও মুখোমুখি সংঘর্ষ কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ। সড়কের পাশে থাকা মানুষও নিরাপদ থাকছেন না।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আহসান কবীর বাপ্পী জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের বড় একটি অংশ তরুণ। ট্রাফিক আইন না মানা, অনিয়ন্ত্রিত মোটরসাইকেল চালানো এবং সড়কের অবস্থাও দুর্ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখছে। গুরুতর আহতদের মধ্যে মাথায় আঘাতের ঘটনা বেশি। অনেককে হাসপাতালে আনার আগেই মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। আবার গুরুতর আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠাতে হয়। হাসপাতালে নিউরোসার্জারি বিভাগ না থাকায় বিশেষায়িত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী শাম্মী সুলতানা বলেন, শুধু সড়ক নির্মাণ ও গতিনিয়ন্ত্রণের অবকাঠামো তৈরি করলেই দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব নয়। এ জন্য সওজ, বিআরটিএ, বিআরটিসি, হাইওয়ে পুলিশ ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যশোর-মাগুরা সড়কের সওজের আওতাধীন প্রায় সাত কিলোমিটারের বিভিন্ন অংশে সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এর আওতায় ট্রাফিক সাইন ও সংকেত স্থাপন করা হবে।
বিআরটিএ যশোর সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) ও অফিসপ্রধান মোহাম্মদ জমির হোসেন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে চালক, যানবাহনের মালিক, যাত্রী ও পথচারী—সব পক্ষের সচেতনতা জরুরি। বিশেষ করে সন্তানদের মোটরসাইকেল চালানোর আগে যথাযথ প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল হতে হবে। অতিরিক্ত গতি ও একটি মোটরসাইকেলে একাধিক আরোহী থাকাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মিরাজুল ইসলাম বলেন, ফিটনেসবিহীন ও নিবন্ধনহীন যানবাহন, বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা এবং হেলমেট ব্যবহার না করার বিরুদ্ধে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। তবে তরুণদের দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সন্তানদের হাতে মোটরসাইকেল তুলে দেওয়ার আগে অভিভাবকদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন এবং চালক ও অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো না গেলে এমন প্রাণহানি ঠেকানো কঠিন হবে।

