রাসেল আহমেদ,খুলনা প্রতিনিধি
খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় অসুস্থ গরু-ছাগলের জরুরি চিকিৎসা, খামার পরিদর্শন ও মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক পরিচালনার জন্য ক্রয় করা সরকারি ডাবল কেবিন পিকআপ গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
ফলে যানবাহন সংকটে পড়েছে দপ্তরটি এবং ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত সরকারি কার্যক্রম। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপজেলার খামারিরা।
প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কেনা মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক বা এমভিসি (ভ্রাম্যমাণ প্রাণিচিকিৎসা ক্লিনিক) হিসেবে পরিচিত গাড়িটি দিঘলিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে পশু চিকিৎসা ও খামার পরিদর্শনের কাজে ব্যবহারের কথা ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (এলডিডিপি) আওতায় বরাদ্দপ্রাপ্ত সরকারি ডাবল কেবিন পিকআপটি (ঢাকা মেট্রো-ঠ-১৩-৭৬৮৩) দিঘলিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। গাড়িটি সংরক্ষণের জন্য অফিস কম্পাউন্ডে লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে একটি গ্যারেজও নির্মাণ করা হয়েছে।
বিধি অনুযায়ী সরকারি গাড়ি কর্ম এলাকার বাইরে নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, দিঘলিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মাহমুদা সুলতানা নিয়মিতভাবে গাড়িটি ব্যক্তিগত যাতায়াতে ব্যবহার করছেন।
গত বছরের ১৫ অক্টোবর তিনি দিঘলিয়া উপজেলায় যোগদান করেন। তবে পরিবার নিয়ে তিনি খুলনা মহানগরীর বয়রা এলাকায় বসবাস করছেন। বয়রা থেকে নদী পার হয়ে দিঘলিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিদিন সকালে সরকারি গাড়ির চালক দিঘলিয়া উপজেলা থেকে বয়রায় গিয়ে ডাঃ মাহমুদা সুলতানাকে তার বাসা থেকে অফিসে নিয়ে আসেন। শুধু তাই নয়, তার কলেজ শিক্ষক স্বামীকেও সরকারি গাড়িতে করে দৌলতপুর বিএল কলেজে কর্মস্থলে পৌঁছে দেওয়া হয়। অফিস শেষে আবার একই গাড়িতে তাকে বয়রার বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয় এবং পরে গাড়িটি অফিস গ্যারেজে রাখা হয়। এছাড়া কখনো কখনো বাসায় পৌঁছে দেওয়ার পর গাড়িটি উপজেলা অফিসে না এনে রাতে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন স্থানে রাখার অভিযোগও উঠেছে।
এদিকে সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে চরম যানবাহন সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক পরিচালনা, খামার পরিদর্শন ও মাঠপর্যায়ের অন্যান্য জরুরি কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন উপজেলার খামারিরা।
গোয়ালপাড়া গ্রামের গরু খামারি আলী আকবর বলেন, বর্তমানে যে ডাক্তাররা আছেন, তাদের দিয়ে সঠিক চিকিৎসা পাওয়া যায় না। এক বছরেও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মাহমুদা সুলতানার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। গত সপ্তাহে প্রদর্শনীর আগের দিন এসে বললেন, তোমার কোনো খোঁজখবর নাই। আমাকে প্রদর্শনীতে যাওয়ার অনুরোধ করেন। প্রদর্শনীতে গিয়েছিলাম, কিন্তু আমি কিছুই পাইনি।
এড্এিন প্রিমিয়াম সুইট গরুর খামারির ম্যানেজার জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের খামারে ছোট-বড় মিলিয়ে ২৮টি গরু রয়েছে। প্রায় আট-নয় মাস ধরে এখানে চাকরি করছি। এই সময়ের মধ্যে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মাহমুদা সুলতানা সরকারি গাড়িতে করে আমাদের খামারে কখনো আসেননি।
অভিযোগ প্রসঙ্গে দিঘলিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মাহমুদা সুলতানা বলেন, সরকারি গাড়ি যে কারণে দেওয়া হয়েছে, তা ছাড়া অফিসিয়াল পারফরম্যান্সের বাইরেও অনেক পারফরম্যান্স আমাকে সামলাতে হয়। সরকারি গাড়ি কোথায় যাবে কিংবা কোন কর্মকর্তা কখন অফিসে আসবেন—এ ধরনের প্রশ্ন আমার কাছে বিব্রতকর। তিনি আরও বলেন, এখন থেকে অন্য উপজেলার গাড়ি কোথায় যায়, স্যারদের খেয়াল রাখতে বলব।
তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, অফিসের সরকারি গাড়ি অফিসারদের বাসায় আনতে ও পৌঁছাতে গেলে কিংবা গাড়িতে স্বামীকে কর্মস্থলে পৌঁছে দিতে গেলে সাংবাদিকদের এত সমস্যা কেন? উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর গাড়ি কোথায় যায়, সে বিষয় নিয়ে তো কেউ কথা বলে না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অধীনে ১৭টি দপ্তর রয়েছে, তিনি তো এসব নিয়ে কোনো কথা বলেন না।
এ বিষয়ে খুলনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, সরকারি গাড়ি কর্মস্থলের বাইরে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। শুধুমাত্র অফিসিয়াল কাজ ছাড়া সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা যাবে না। দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য কোনো উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সরকারি গাড়ি ব্যবহার করতে পারবেন না।

