দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে টানা তিন দিনে পৃথক তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত মাদক, অনলাইন জুয়া ও সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। একের পর এক হত্যাকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সর্বশেষ শুক্রবার (২ অক্টোবর) উপজেলার হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের সোনাইকুন্ডি তাজপুর গ্রামে মাদক সেবনের জন্য টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে মাদক সেবনের জন্য রাসেল হোসেন (৩৫) তার বাবা আহাদ হোসেনের কাছে ২০০ টাকা চান। রাসেল দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত হওয়ায় তার অত্যাচারে পরিবারের সদস্যরা অতিষ্ঠ ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান। বাবা ২০০ টাকার পরিবর্তে তাকে ২০ টাকা দিয়ে চলে যেতে বললে রাসেল ক্ষিপ্ত হয়ে বাবাকে মারধর করেন।
বাবাকে মারধরের খবর পেয়ে ছোট ভাই ইমরান হোসেন (৩০) বাড়িতে এসে ডাব কাটার হাসুয়া দিয়ে রাসেলের পায়ে কোপ দেন বলে অভিযোগ। এতে গুরুতর আহত রাসেলকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
নিহত রাসেল একই গ্রামের ডাব ব্যবসায়ী আহাদ হোসেনের বড় ছেলে। অভিযুক্ত ইমরান শিল্পনগরী আল্লারদর্গায় একটি পারটেক্স কোম্পানিতে কর্মরত। রাসেলের বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় তিনটি এবং ঈশ্বরদী থানায় একটি মাদক মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার পর ইমরান পলাতক রয়েছেন।
এর আগের দিন বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেলে দৌলতপুর সীমান্তে মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে গোলাম মোস্তফা টেঙ্গুর (৫৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের সীমান্তসংলগ্ন চড়ইকুড়ি (মরার চর) গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়দের দাবি, সংঘর্ষের সময় উভয় পক্ষ প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণও করে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত আটজন আহত হন। নিহত টেঙ্গুর একই গ্রামের মৃত দৈয়ব মন্ডলের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভারত থেকে পাচার করে আনা মাদককে কেন্দ্র করে রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ও স্থানীয় বিএনপি নেতা আজাহার মেম্বার ওরফে আজা মেম্বার এবং নিহত টেঙ্গুরের বড় ভাই রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পটল গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। সংঘর্ষে টেঙ্গুর নিহত হন।
এ ঘটনার পর নিহতের স্বজন ও প্রতিবেশীরা আজাহার মেম্বার ও তার স্বজনদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে গরু, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন মালামাল লুট ও ভাঙচুর করেছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
এর আগে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) অনলাইন জুয়ায় আর্থিক বিরোধের জেরে রাজা বিশ্বাস (২৫) নামে এক যুবককে হত্যার অভিযোগ ওঠে তার বন্ধুদের বিরুদ্ধে। পরে উপজেলার পিয়ারপুর ইউনিয়নের কামালপুর সাতবিল মাঠে একটি সড়কের পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, অনলাইন জুয়ায় বড় অঙ্কের টাকা হেরে আর্থিক সংকটে পড়েন রিফাজ হোসেন (২৬)। সেই টাকা জোগাড় করতে তিনি বন্ধু রাজা বিশ্বাসকে মাঠের মধ্যে ডেকে নিয়ে হত্যা করেন বলে পুলিশের দাবি। পরে রাজাকে হত্যার পর তার পরিবারের কাছে টাকা দাবি করা হয়।
এ ঘটনায় রিফাজ হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনি কামালপুর গ্রামের সফেদ হোসেনের ছেলে। নিহত রাজা একই এলাকার ইমাম আলীর ছেলে। এ ঘটনায় মামলা হলেও এখন পর্যন্ত আর কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি বলে জানিয়েছে নিহতের পরিবার।
টানা তিন দিনে তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দৌলতপুরের সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং জনমনে স্বস্তি ফিরবে।
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান বলেন, “গত তিন দিনে দৌলতপুরে তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যেন অবনতি না ঘটে, সে বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে এবং নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে।

