মফিজুল ইসলাম, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বড়ুরিয়া সহ অন্তত ১০টি গ্রাম গড়াই নদীর ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়েছে। প্রতিনিয়ত ভাঙছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট—নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের ভিটেমাটি। আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর বেদনায় জীবন পার করছেন এই এলাকার মানুষ।
বড়ুরিয়া গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর মন্ডল জানান, “আমার ১০ বিঘা ফসলি জমি নদীতে চলে গেছে। যেভাবে ভাঙছে, ভিটেমাটিও আর রক্ষা করা যাবে না মনে হয়।”
জুন মাসের শুরু থেকে শুরু হওয়া নদীভাঙন এখন রূপ নিয়েছে ভয়াবহতায়। কলা, পাট, হলুদসহ নানা ধরনের ফসলি জমি একে একে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফেলা জিও ব্যাগও নদীর প্রচণ্ড স্রোতে ভেসে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শৈলকুপা উপজেলার গড়াই নদীর প্রায় ২০ কিলোমিটার প্রবাহমান অংশের মধ্যে বড়ুরিয়া গ্রামে দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন সবচেয়ে ভয়াবহ। এছাড়া কৃষ্ণনগর, গোসাইডাঙ্গা, মাদলা, মাঝদিয়া, উলুবাড়িয়া, কাশিনাথপুর, গোবিন্দপুর, নলখোলা, চরপাড়া, বদনপুর ও লাঙ্গলবাঁধ গ্রামও রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে।
বড়ুরিয়ার মোট ৭০০ পরিবারের মধ্যে বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ২০০ পরিবার। বাকিরা ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। সিএস রেকর্ড অনুযায়ী, এই গ্রামের মোট জমি ছিল ১৪৫৭ বিঘা। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৫০ বিঘায়।
স্থানীয় বাসিন্দা বাবুল মোল্লা বলেন, “১৯৬২ সাল থেকে ভাঙন শুরু হলেও গত ২০ বছরে তা ভয়াবহ হয়েছে।” অন্য বাসিন্দা সুন্দরী খাতুন জানান, “একসময় ৩০ বিঘা জমি ছিল, এখন আছে মাত্র ১০ বিঘা।”
এদিকে, গড়াই নদীর ওপারে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার গনেশপুর এলাকায় ভাঙনে জমি হারালেও জেগে ওঠা চরে চাষ করতে পারছেন না শৈলকুপার মানুষ। অভিযোগ রয়েছে, খোকসার বাসিন্দারা ওই জমি দখল করে নিচ্ছেন এবং শৈলকুপার কৃষকদের সেখানে ঢুকতে দিচ্ছেন না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস বলেন, “বর্তমানে বর্ষা মৌসুমে অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। প্রকল্পটি ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে চার ধাপে বাস্তবায়িত হবে এবং ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত চলবে। এরপর স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।”
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল বলেন, “ভাঙনের ফলে জেগে ওঠা চর এলাকায় শৈলকুপার মানুষের চাষাবাদ নিশ্চিত করতে আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। ইতোমধ্যে জরিপ অধিদপ্তরে পত্র পাঠানো হয়েছে, যাতে সীমানা নির্ধারণ করে জমির মালিকানা নির্ধারণ করা যায়।”
এই অবস্থায় দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, জমি উদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে মানচিত্র থেকে একদিন চিরতরে মুছে যাবে বড়ুরিয়াসহ আরও কয়েকটি গ্রাম।

