রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
খুলনার দিঘলিয়া ও নড়াইলের কালিয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা গাজীরহাট ও হামিদপুর ইউনিয়নে সন্ত্রাসীদের দাপটে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আধিপত্য বিস্তার ও গাজীরহাট বাজারের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই ইউনিয়নের রাজনৈতিক গ্রুপগুলোর মধ্যে চলমান সংঘর্ষে আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে বহু মানুষ। বন্ধ হয়ে গেছে শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। স্থানীয়রা বলছেন, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ না করলে সামনে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সহিংসতা ঘটে ১৫ মার্চ, যেখানে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে সিলিমপুর গ্রামের হাসিম মোল্লা নিহত হন। এই ঘটনায় আহত হন দুই পুলিশ সদস্যসহ আরও কয়েকজন। পরদিন সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ অভিযানে জনি মোল্যা গ্রুপের দুইজনকে অস্ত্রসহ আটক করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গাজীরহাট বাজারের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চলে আসছে। বাজারটি একটি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র হওয়ায় একে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা পেতে চায়। আগে এই বাজার বংশীয় প্রভাবের আওতায় থাকলেও ৯০-এর দশক থেকে রাজনীতিকরনের ফলে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেও গাজীরহাট বাজার তখনো কোনো একক নেতার নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ নেতা মফিজুল ইসলাম ঠান্ডু মোল্লা ও তার ভাই যুবলীগ নেতা হামীম মোল্লা বাজারের নিয়ন্ত্রণ নেন। ঠান্ডু মোল্লা পরবর্তীতে গাজীরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
তবে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর মফিজুল ইসলাম ঠান্ডু ও তার ভাই একাধিক মামলায় অভিযুক্ত হয়ে আত্মগোপনে চলে যান। সেই সুযোগে অন্য একটি রাজনৈতিক দলের দুই গ্রুপ বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিতে জড়িয়ে পড়ে সশস্ত্র বিরোধে।
১৩ মার্চ জনি মোল্যা গ্রুপ ঠান্ডু মোল্লার অনুসারী রউফ মোল্যাকে বাজার থেকে বের করে দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় পরদিন রউফের লোকজন হামলা চালালে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। এ ঘটনায় শুধু হাসিম মোল্লার মৃত্যু নয়, পরবর্তী দিনগুলোতে একাধিক দফায় হামলা, লুটপাট ও বাড়িঘর ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে। মফিজুল ইসলাম ঠান্ডুর পরিবারের বাড়িসহ একাধিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়।
এলাকাবাসী জানায়, বর্তমানে বাজারের বৈধ কমিটিকে উচ্ছেদ করে একটি অনির্বাচিত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উভয় গ্রুপই মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। এতে বাজার কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। আতঙ্কে অনেক ব্যবসায়ী দোকান না খুলে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
এ পর্যন্ত গাজীরহাট ও হামিদপুর এলাকায় কমপক্ষে আটজন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় চেয়ারম্যান, যুবলীগ নেতা, ও সাধারণ গ্রামবাসী।
পুলিশও এদের হামলার বাইরে নয়। গত ছয় মাসে অন্তত দু’বার পুলিশের ওপর হামলা হয়েছে, এতে আহত হয়েছেন পাঁচ-ছয়জন পুলিশ সদস্য।
স্থানীয়দের দাবি, অস্ত্র উদ্ধারই শান্তির প্রথম পদক্ষেপ।
তাঁদের মতে, সন্ত্রাসীদের হাতে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র থাকায় এলাকায় হত্যা, চাঁদাবাজি, লুটতরাজ বেড়েছে। পুলিশ প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ ও সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও গ্রুপগুলোর দমন না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

