রাসেল আহমেদ,খুলনা প্রতিনিধি
খুলনায় প্রবেশ করতে গিয়েই চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে যাত্রী ও সাধারণ মানুষকে। শহরের তিনটি প্রধান প্রবেশদ্বারের প্রায় ৮ কিলোমিটার সড়ক বছরের পর বছর ধরে মেরামত না হওয়ায় বর্তমানে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে এই সড়কগুলোর উন্নয়ন বারবার আটকে যাচ্ছে। ফলে এসব সড়কে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। ছোটখাটো নয়, অনেক সময় তা বড় দুর্ঘটনায় রূপ নিচ্ছে।
সড়ক সংস্কার ও উন্নয়নের দাবিতে খুলনার বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক সংগঠন বারবার আন্দোলন ও মানববন্ধন করলেও আশানুরূপ কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। নাগরিক নেতারা এর জন্য সরকারি দপ্তরগুলোর চরম সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন।
তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগরীতে প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। এর মধ্যে মোস্তফার মোড় থেকে রায়েরমহল পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য ২ কিলোমিটার, যেটি কেসিসির নিয়ন্ত্রণে। খানজাহান আলী সেতু থেকে রূপসা ট্রাফিক মোড় পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ শিপইয়ার্ড সড়কটি কেডিএ-এর আওতায়। এছাড়া ২.১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সোনাডাঙ্গা বাইপাস সড়কটি কেডিএ ও কেসিসি’র যৌথ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এই তিনটি প্রবেশপথ দিয়ে প্রতিদিন দেশের অন্তত ১৮টি জেলা থেকে যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহন খুলনায় প্রবেশ করে।এই সড়কগুলোর পাশেই রয়েছে প্রায় ১৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ২৭টি চালকল, ২৪৩টির মতো কাঠগোলা ও অসংখ্য ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। হতাশাজনক সড়ক ব্যবস্থার কারণে শুধু যানবাহন নয়, প্রতিদিন দুর্ঘটনায় আহত হচ্ছেন নারী-শিশুসহ সাধারণ মানুষ।
২০১০ সালে কেডিএ রূপসা ট্রাফিক মোড় থেকে খানজাহান আলী সেতু পর্যন্ত শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়। ২০১৩ সালে এটি একনেকে অনুমোদিত হলেও এক যুগ ধরে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। দফায় দফায় মেয়াদ ও ব্যয় বাড়িয়েও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
খুলনা শহর সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ২০১১ সালে শুরু হয় সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল সংলগ্ন সংযোগ সড়কের নির্মাণ কাজ। মাত্র দুই বছরেই কাজ শেষ হলেও, কিছুদিনের মধ্যে সড়কে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। এরপর কয়েক দফা মেরামত করেও তা টেকেনি। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থাই সড়ক ধ্বংসের মূল কারণ বলে জানান স্থানীয়রা।
২০২২-২৩ অর্থবছরে ‘ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লী সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন’ প্রকল্পের আওতায় শুরু হয় মোস্তফার মোড় থেকে রায়েরমহল পর্যন্ত ৩.২ কিলোমিটার সড়কের সংস্কার। বছরের পর বছর গড়িমসির পর কাজ শেষ হলেও অল্প সময়েই তা গর্তে পরিণত হয়।
সোনাডাঙ্গা বাইপাস সড়কে চলাচলকারী বাসচালক কাওসার শেখ বলেন, “কর্তৃপক্ষ আমাদের মানুষই মনে করে না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাই। প্রতিদিন কেউ না কেউ দুর্ঘটনায় পড়ছে।”
রায়েরমহল এলাকার চাতাল মালিক লিটন বলেন, “রাস্তায় পানি জমে গর্ত হচ্ছে। এতে করে চাল পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এছাড়া দুর্ঘটনা তো লেগেই আছে।”
শিপইয়ার্ড এলাকার বাসিন্দা সেলিম গাজীর অভিযোগ, “ভেবেছিলাম উন্নত জীবনের জন্য শহরে এসেছি, কিন্তু এমন রাস্তা এখন গ্রামেও নেই।”
নিরাপদ সড়ক চাই খুলনা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. মাহবুবুর রহমান মুন্না ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা বহুবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে গেছি। কিন্তু একে অপরের ওপর দোষ চাপিয়ে সড়কগুলোর অভিভাবকই নেই। প্রতিবাদ স্বরূপ আমরা ধানের চারা রোপণ করেছি, কেডিএ-কে লাল কার্ড দেখিয়েছি।”
কেডিএ’র প্রকল্প পরিচালক মোর্ত্তজা আল মামুন জানান, “চুক্তি বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। প্রক্রিয়া নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলছে বলে কাজ শুরু হতে কিছুটা দেরি হচ্ছে।”
এদিকে, কেসিসি’র প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবির উল জব্বার বলেন, “সোনাডাঙ্গা সংযোগ সড়কের অর্ধেক আমাদের আওতায়, বাকিটা এলজিইডির। এলজিইডি এখনও তাদের অংশ বুঝিয়ে দেয়নি। এজন্য আমরা কোনো কার্যক্রম শুরু করতে পারিনি।”
নগরবাসীর একটাই দাবি—সমন্বয়হীনতা দূর করে দ্রুত সড়কগুলোর সংস্কার করা হোক। শুধু উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া নয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন করে খুলনার প্রধান প্রবেশপথগুলোকে চলাচলের উপযোগী করে তোলা হোক—এটাই এখন সময়ের দাবি।

