রাসেল আহমেদ,খুলনা প্রতিনিধি
খুলনার সেনেরবাজার-জেলখানা খেয়াঘাটে ট্রলারচালকদের দৌরাত্ম্য, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন ও খেয়ালখুশিমতো ট্রলার চালানোর কারণে প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়ছেন হাজারো যাত্রী। দীর্ঘদিন ধরেই চলমান এ অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত নেওয়া হয়নি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা।
গত ২১ আগস্ট রাতে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান আইচগাতী এলাকার আকাশ নামের এক যুবক। তিনি খুলনার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। দোকান ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে, খেয়াঘাটে একটি ট্রলারের সঙ্গে ফেরির সংঘর্ষ হয়। ট্রলারটি আংশিকভাবে ফেরির নিচে চলে গেলে কয়েকজন যাত্রী নদীতে পড়ে যান। নিখোঁজ থাকার দুই দিন পর, ২৩ আগস্ট বটিয়াঘাটার বামনপাড়া নদীর কূলে আকাশের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা এবং তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
দুর্ঘটনার পরদিন, ২২ আগস্ট আইচগাতীর স্থানীয় বাসিন্দারা বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। বিক্ষোভে অংশ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা আজমল হোসেন খোকন বলেন, “২০ জনের ধারণক্ষমতার ট্রলারে মাঝিরা প্রায়ই ৩৫-৪০ জন যাত্রীসহ বাইসাইকেল ও মোটরসাইকেল তুলে দিচ্ছেন। এরা কেউই স্থানীয় না, বাইরের এলাকা থেকে এসে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এ অনিয়ম করছে।”
যাত্রী হয়রানির আরেকটি দিক তুলে ধরেন স্থানীয় বাসিন্দা খাঁন তৈয়বুর রহমান। তিনি জানান, “সকাল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত জনপ্রতি ১০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। কিন্তু অতিরিক্ত টাকা দিলে ভাংতি ফেরতের কোনো দায় নেয় না মাঝিরা। এ টাকা যে শুধু মাঝিরাই রাখছে তা নয়, এর ভাগ পৃষ্ঠপোষকরাও পাচ্ছে। তাই আন্দোলন শুধু মাঝিদের নয়, তাদের রক্ষাকারীদের বিরুদ্ধেও হওয়া দরকার।”
সেনেরবাজার এলাকার মো. মুস্তাফিজুর রহমান লাবু বলেন, “যাত্রীর সংখ্যা সীমিত না রেখে যেভাবে গাদাগাদি করে পার করা হয়, তাতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা যে কোনো সময় ঘটতে পারে। আমরা শুধু চাই, অন্তত ২০ জন যাত্রী নিয়ে যেন ট্রলার চলে এবং অতিরিক্ত ভাড়া না নেওয়া হয়।”
দেয়াড়া এলাকার বাসিন্দা খাঁন রমিজ মাঝিদের দুর্ব্যবহার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রতিবাদ করলে কিছুদিন ভালো থাকে, পরে আবার আগের মতোই চলে। কারণ তারা জানে, কোন নেতার সঙ্গে থাকলে সব চলবে। অনেক সময় যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করে, কিন্তু অনেকে মানসম্মানের ভয়ে কিছু বলেন না।”
ঘাটে কর্মরত কয়েকজন মাঝিও স্বীকার করেছেন যে, অনিয়ম শুধু তাদের কারণে হচ্ছে না—ঘাট ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব না থাকায় সমস্যাগুলো দিন দিন বাড়ছে। তাদের দাবি, ট্রলারে কোনো ধরনের আলো না থাকায় রাতে অন্ধকারে যাত্রী পারাপার করতে হয়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাশাপাশি সড়ক বিভাগ, জেলা পরিষদ ও বিআইডব্লিউটিএর মধ্যে ঘাটের মালিকানা নিয়ে চলমান দ্বন্দ্বের বিষয়টিও আদালতে বিচারাধীন।
আইচগাতী এলাকার বাসিন্দা ও খুলনা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আতাউর রহমান রনু জানান, “জেলখানা ঘাটে মাঝিদের তদারকির জন্য কোনো স্থায়ী কমিটি নেই, কেউ তাদের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্বে নেই। শাহিন, বরকত, মামুনসহ কয়েকজন মিলে ঘাট পরিচালনা করছে। আমি নিজেও অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের অভিযোগ পেয়েছি। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে এ অনিয়মের বিরুদ্ধে স্থানীয় ও রাজনৈতিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
একাধিকবার দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও যাত্রী হয়রানির পরও এখনো পর্যন্ত ঘাটে কোনো স্থায়ী সমাধান দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয়রা মনে করছেন, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই অনিয়ম বন্ধ হবে না।
তারা দ্রুত যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত, নিয়মিত তদারকি ব্যবস্থা চালু এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

