যশোর প্রতিনিধি
অকাল জলাবদ্ধতা ও টানা অতিবৃষ্টির কারণে যশোর সদরের পাটচাষিরা এবার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ভরা মৌসুমের আগেই ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে অপরিপক্ব পাট কাটতে হচ্ছে কৃষকদের। এতে যেমন ফলন ও আঁশের গুণগত মান কমে যাচ্ছে, তেমনি বেড়ে গেছে উৎপাদন ও শ্রমিক ব্যয়। ফলে চরম আর্থিক ক্ষতির শঙ্কায় রয়েছেন তারা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা এবং পাটের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণে সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন চাষিরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে পাট কাটার উপযুক্ত সময়। কিন্তু এবার আষাঢ় থেকেই অতিবৃষ্টিতে মাঠের পর মাঠ পানিতে তলিয়ে যায়। দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় পাটগাছের গোড়ায় পচন ধরতে শুরু করেছে। অনেক জমিতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে থাকায় বাধ্য হয়ে সময়ের প্রায় এক মাস আগেই পাট কাটতে হচ্ছে।
রামনগর ও চাঁচড়া ইউনিয়নের হরিণার বিল এলাকার কৃষকরা জানান, অপরিপক্ব অবস্থায় পাট কাটায় আঁশ মোটা ও শক্ত হওয়ার আগেই সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ফলে ধোয়ার পর আঁশ নরম ও নিম্নমানের হয়ে যাচ্ছে, যা বাজারে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
কৃষক পলাশ কুমার সরকার বলেন, “স্বাভাবিক সময়ে পাঁচ কাঠা জমির পাট কাটতে একজন শ্রমিক লাগত। এখন পানির কারণে এক কাঠা জমিতেই একজন শ্রমিক প্রয়োজন হচ্ছে। শুধু কাটা ও ধোয়ার খরচই প্রতি কাঠায় প্রায় এক হাজার টাকা।”
কৃষক দেবাশীষ পাল জানান, তার দেড় বিঘা পাটক্ষেত বিলের পানিতে তলিয়ে গেছে। বিঘাপ্রতি সার, নিড়ানি ও শ্রমিক বাবদ প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমান বাজারদরে পাট বিক্রি করলে উৎপাদন খরচও উঠবে না।
জলাবদ্ধতার প্রভাব শুধু পাটেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষক সুকুমার পাল জানান, তার আট বিঘা জমিতে রোপণের জন্য প্রস্তুত করা পাঁচ কাঠা আমন ধানের চারাও পানিতে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে নতুন করে চারা কিনে রোপণ করতে হবে।
কৃষক খোকন বিশ্বাস ও স্বপন কুমার বলেন, “আরও এক মাস পর পাট কাটতে পারলে ভালো ফলন পাওয়া যেত। কিন্তু এখন পাট রক্ষা করতেই আগেভাগে কাটতে হচ্ছে। আবার পানিতে পাট জাগ দেওয়া ও ধোয়া নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছি।”
বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ বিবেচনায় প্রতি মণ পাটের দাম কমপক্ষে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ না হলে তারা মারাত্মক লোকসানের মুখে পড়বেন।
এ বিষয়ে যশোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা বলেন, যশোর সদরে এবার ১ হাজার ৭২০ একর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। রামনগর ও চাঁচড়া ইউনিয়নের কিছু নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে এবং পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকায় সমস্যা বেড়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি, যেসব পাট কাটার উপযোগী হয়েছে বা পচন ধরতে শুরু করেছে, সেগুলো দ্রুত কেটে ফেলতে। কারণ দীর্ঘদিন পানিতে থাকলে পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।”

