মাঈন উদ্দিন সরকার রয়েল, কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি
বাংলার লোকসংস্কৃতির অন্যতম প্রাণধারা বাউল সংগীত যুগে যুগে মানুষকে মানবতা, ভালোবাসা, সাম্য, সহমর্মিতা ও আত্মজিজ্ঞাসার শিক্ষা দিয়ে এসেছে। আধুনিকতার চাপে লোকজ সংস্কৃতির অনেক উপাদান হারিয়ে গেলেও কিছু নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীর হাত ধরে সেই ঐতিহ্য আজও টিকে আছে। তেমনই একজন ছিলেন নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ী ইউনিয়নের কলসহাঁটি গ্রামের প্রয়াত বাউল সাধক এলাহি নেওয়াজ দুলু খাঁ।
লোকসংস্কৃতিপ্রেমীদের কাছে দুলু খাঁ শুধু একজন বাউল শিল্পীই নন, বরং একজন মানবতাবাদী সাধক ও লোকঐতিহ্যের ধারক-বাহক হিসেবে পরিচিত। তাঁর কণ্ঠে বাউল গান মানবপ্রেম, আত্মশুদ্ধি, অসাম্প্রদায়িকতা ও সহজ জীবনদর্শনের বার্তা বহন করত। গ্রামবাংলার মাটি, প্রকৃতি, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং আধ্যাত্মিক চেতনা তাঁর গানে জীবন্ত হয়ে উঠত।
জানা যায়, বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রখ্যাত মরমী সাধক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত বাউল কবি জালাল উদ্দিন খাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে দুলু খাঁ অন্যতম ছিলেন। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, তিনি একসময় জালাল উদ্দিন খাঁর প্রথম শিষ্যও ছিলেন। তাঁর গান গ্রামীণ জনপদ ছাড়িয়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লোকজ উৎসবেও সমাদৃত হয়েছিল।
গবেষক ও স্থানীয় সংস্কৃতিসেবীদের মতে, দুলু খাঁর পূর্বপুরুষরা ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে লাহোর থেকে এ অঞ্চলে এসেছিলেন। তাঁদের বংশধররা এখনও কলসহাঁটি গ্রামে বসবাস করছেন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
লোকসংস্কৃতি গবেষকদের ভাষ্য, বাউলধারা বাংলার অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির অন্যতম ভিত্তি। এই ধারার মূল দর্শন মানুষকে ধর্ম, বর্ণ ও বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিতে শেখায়। এলাহি নেওয়াজ দুলু খাঁ তাঁর শিল্পচর্চার মাধ্যমে সেই চেতনাই লালন করেছেন।
স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীরা মনে করেন, এ ধরনের গুণী শিল্পীদের অবদান সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, প্রয়াত দুলু খাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ, তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা এবং মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি প্রদান করলে নতুন প্রজন্ম বাংলার সমৃদ্ধ লোকঐতিহ্য সম্পর্কে আরও আগ্রহী হবে।
সংস্কৃতিসেবীরা বলেন, বাংলার মাটির গন্ধমাখা বাউল গান আজও মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। সেই মানবতার বাণীই আজীবন নিজের কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন বাউল সাধক এলাহি নেওয়াজ দুলু খাঁ। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ ও কর্মকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।

