রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
খুলনার তেরখাদা উপজেলার ছাগলাদহ বাজারে শতবর্ষী ঐতিহ্য ধরে আবারও অনুষ্ঠিত হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বুড়িমায়ের মহোৎসব ও দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা। মঙ্গলবার (১২ মে) অনুষ্ঠিত ৬০তম বার্ষিক এ আয়োজনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের ঢল নামে পুরো এলাকায়।
সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে চলে পূজা-অর্চনা, সংকীর্তন, প্রসাদ বিতরণ, মানত পালন এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যের বৈশাখী মেলা। প্রায় ৩০০ বছরের ঐতিহ্য বহন করে আসা এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে শুধু খুলনা বা তেরখাদা নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা এখানে সমবেত হন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশাল বটগাছের ছায়াতলে স্থাপিত বুড়িমায়ের প্রতিমায় ভক্তরা সিঁদুর মাখিয়ে পূজা দিচ্ছেন। কেউ মিষ্টি, ফিরনি ও নানা ধরনের প্রসাদ বিতরণ করছেন, আবার কেউ মানত পূরণের আশায় প্রার্থনা করছেন। অনেকে পাশের চিত্রা নদীতে পুণ্যস্নানের উদ্দেশ্যেও আসেন। মানত পূর্ণ হলে পরের বছর এসে মানতের বস্তু উৎসর্গ করার প্রচলনও রয়েছে এখানে।
স্থানীয় বাসিন্দা শ্রীবাস বলেন, “এখানে মানুষ মানত করে যায়। পরে সেই মানত পূর্ণ হলে আবার এসে মানত অনুযায়ী জিনিসপত্র দিয়ে যায়।”
মেলায় ঘুরতে আসা শিশু আবু ছাদ বলে, “আমি মেলায় ঘুরতে এসেছি। আমার ছোট বোনের জন্য কিছু জিনিস কিনেছি।”
সারা দিনজুড়ে বুড়িমায়ের জয়গান, ঢাক-ঢোল ও বাদ্যযন্ত্রের শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সংকীর্তনের সুরে সৃষ্টি হয় এক ভক্তিময় পরিবেশ।
মেলায় প্রায় পাঁচ শতাধিক স্টল বসে। সেখানে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নানা পণ্যসামগ্রী বিক্রি হয়। কুলা, ঝুড়িসহ হস্ত ও কুটির শিল্পজাত পণ্যের প্রতি দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। নারী-পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধসহ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে মেলাটি রূপ নেয় এক বিশাল সম্প্রীতির মিলনমেলায়।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, বুড়িমা ছিলেন অলৌকিক জ্ঞানসম্পন্ন এক মহান যোগী মাতা। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, রোগমুক্তি এবং মনোবাসনা পূরণে তার আশীর্বাদের নানা কাহিনি আজও প্রচলিত রয়েছে এলাকায়। এ কারণে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ এখানে এসে প্রার্থনা করেন।
উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি ও ছাগলাদহ বুড়িমায়ের গাছতলা কমিটির নির্বাহী সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অরবিন্দ প্রসাদ সাহা বলেন, “এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য মিলনমেলা। সব মানুষের মনোবাসনা পূর্ণ হোক—এই কামনাই করি।”
এদিকে উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে পুরো অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা সুলতানা নীলা এবং থানার ওসি মো. শহিদুল্লাহর তত্ত্বাবধানে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
মেলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দও উপস্থিত থেকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।

