রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
খুলনা জেলা ও মহানগরীতে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ৩৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রকাশ্যে গুলি, কুপিয়ে হত্যা এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে হত্যার মতো ঘটনায় নগর ও জেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিরাপত্তা তৈরি হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত খুলনা মহানগরীতে ১৭টি এবং জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ২০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে জেলা ও মহানগর মিলিয়ে অন্তত ৮৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা শনাক্ত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ১২ জুন নগরীর লবণচরা থানার মাথাভাঙা এলাকার কাজীপাড়া বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় ব্যবসায়ী ও বিএনপি কর্মী রফিকুল ইসলামকে (৩৫)। মোটরসাইকেলে আসা হেলমেটধারী এক দুর্বৃত্ত তার তলপেটে গুলি করে পালিয়ে যায়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এর আগে ৩০ মে রাতে সোনাডাঙ্গা থানার তমিজ উদ্দিন সড়কের একটি বাসা থেকে বেবী বেগম (৫৫) এবং তার দুই নাতি শামিম (১৩) ও মুস্তাকিমের (৪) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে রফিকুল ইসলামকে আটক করা হয়েছে।
গত ২ জুন লবণচরার সাচিবুনিয়া এলাকায় কাজী রাশিদুল ইসলাম নামে এক যুবককে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া ৪ মার্চ রূপসা উপজেলার ডাকবাংলা মার্কেটের একটি জুতার দোকানে শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ এবং পারিবারিক দ্বন্দ্বের জেরে অপরাধ প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বর্তমানে খুলনা মহানগর ও জেলায় অন্তত নয়টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর ‘বি-কোম্পানি’, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ, নাসিম গ্রুপ, পলাশ গ্রুপ এবং হুমা বাহিনী।
নগরীর ডাকবাংলো এলাকার বাসিন্দা তৈয়বুর রহমান বলেন, “এক সময়ের শান্তির নগরী খুলনা এখন আতঙ্কের শহরে পরিণত হয়েছে। খুন, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনায় মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।”
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। প্রায় প্রতিদিনই খুনের ঘটনা ঘটছে, নদী-খাল থেকে মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে। প্রশাসনের নানা উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন, “মাদক ব্যবসাই অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। মাদককারবারিরা কিশোর গ্যাংকে ব্যবহার করছে, ফলে সহিংসতা বাড়ছে। পাশাপাশি বিচারহীনতার সংস্কৃতিও অপরাধকে উৎসাহিত করছে।”
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।”
তবে অপরাধ দমনে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন খুলনা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান। তিনি বলেন, “ঘটিত অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।”
ক্রমবর্ধমান হত্যাকাণ্ড ও অপরাধ প্রবণতায় খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

