ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি
পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলায় গ্রাহকদের জমা দেওয়া বিদ্যুৎ বিলের প্রায় ৭০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মী (গার্ড) উজ্জ্বল মিস্ত্রী রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রায় ৪ হাজার ৪০০ গ্রাহকের জমা দেওয়া অর্থের হিসাব গরমিল পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জেএসএস সিকিউরিটি কোম্পানির মাধ্যমে ভাণ্ডারিয়া কৃষি ব্যাংকে নিয়োজিত নিরাপত্তাকর্মী উজ্জ্বল মিস্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো)-এর বিদ্যুৎ বিল সংগ্রহের কাজে যুক্ত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও তাকে নিয়মিত ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টারে বসিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিলের টাকা গ্রহণ করানো হতো। আর্থিক লেনদেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে একজন নিরাপত্তাকর্মীকে নিয়োজিত করায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, উজ্জ্বল মিস্ত্রী ও ওজোপাডিকোর ভাণ্ডারিয়া বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যালয়ের আউটসোর্সিং কম্পিউটার অপারেটর সুশান্ত এবং নেয়ামত উল্লাহ রেজভীর যোগসাজশে গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায়কৃত অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে যথাযথভাবে জমা দেওয়া হয়নি। ফলে বিপুল অঙ্কের অর্থের হিসাব গরমিলের ঘটনা সামনে আসে।
সূত্র জানায়, কম্পিউটার অপারেটর সুশান্ত ও নেয়ামত উল্লাহ রেজভীর দায়িত্ব ছিল নিয়মিতভাবে বিদ্যুৎ বিল আদায়ের হিসাব যাচাই-বাছাই করে আবাসিক প্রকৌশলী মো. ফিরোজ হোসেন সন্যমতের কাছে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল পরিমাণ অর্থের গরমিল থাকলেও বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, উজ্জ্বল মিস্ত্রী গত ১৮ জুন সর্বশেষ কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন। এরপর থেকে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রায় ৪ হাজার ৪০০ গ্রাহকের প্রায় ৭০ লাখ টাকার হিসাব গরমিল শনাক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও গ্রাহকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিল গ্রহণ করা হয়েছে। গত ৫ জুন শুক্রবার ৬২২ জন গ্রাহকের কাছ থেকে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৭৫১ টাকা এবং ৬ জুন শনিবার ৫২৮ জন গ্রাহকের কাছ থেকে ৬ লাখ ৫৪ হাজার ৭১৬ টাকা আদায় করা হয়। এসব অর্থের তথ্য সিস্টেমে এন্ট্রি করা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনা প্রকাশের পর ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা তাদের জমা দেওয়া অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা দ্রুত অর্থ উদ্ধার, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে ভাণ্ডারিয়া বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যালয়ের আবাসিক প্রকৌশলী মো. ফিরোজ হোসেন সন্যমত জানান, ঘটনার তদন্তে ব্যাংক ও বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। কোনো সংঘবদ্ধ জালিয়াতি চক্র জড়িত রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি জানান, ওজোপাডিকোর বরিশাল অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে বরিশাল আঞ্চলিক হিসাব শাখার ব্যবস্থাপক মো. রেজাউল করিমকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন নির্বাহী প্রকৌশলী (বিক্রয় ও বিতরণ) মো. মতিউর রহমান, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী দীপক মিস্ত্রী এবং সহকারী প্রকৌশলী ইমানুর রহমান। কমিটিকে চার কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ভাণ্ডারিয়া শাখার ব্যবস্থাপক মিঠুন সাহ-এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ব্যাংকে পাওয়া যায়নি। অফিসের মোবাইল নম্বরেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি ব্যাংকের দাপ্তরিক কাজে বাগেরহাটে অবস্থান করছেন।

