যশোর প্রতিনিধি
একটু ভারী বৃষ্টি হলেই পানির নিচে তলিয়ে যায় যশোর শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, আবাসিক এলাকা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বর্ষা এলেই পৌরসভার ৫, ৬, ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েক হাজার মানুষকে পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাতে হয়। নাগরিকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর শত কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কার করা হলেও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬৩ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কারে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই এ খাতে ব্যয় হয়েছে ২২ কোটি টাকা। এছাড়া প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৪৬ দশমিক ৯৭ কিলোমিটার ড্রেন পরিষ্কারের উদ্যোগও নেওয়া হয়। তখন পৌর কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল, এবার শহরে জলাবদ্ধতা হবে না। কিন্তু সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণে সেই দাবি বাস্তবায়িত হয়নি।
স্থানীয়দের মতে, একসময় শহরের পানি প্রাকৃতিকভাবে বিভিন্ন খাল হয়ে বিলহরিণায় গিয়ে জমা হতো। পরে সেখান থেকে তা মুক্তেশ্বরী নদীতে প্রবাহিত হতো। কিন্তু দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল, ভরাট, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং বাণিজ্যিক মাছের ঘেরের কারণে সেই প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ড্রেন থাকলেও পানি বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ না থাকায় বৃষ্টির পানি শহরেই আটকে যাচ্ছে।
লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট বেনজীন খান বলেন, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ছাড়াই কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। ড্রেন গভীর করা হলেও পানির প্রবাহের সঠিক দিক নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে পানি স্থির হয়ে থাকে এবং জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
তিনি আরও বলেন, নাগরিকদের অসচেতনতাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। প্লাস্টিক ও বর্জ্য ড্রেনে ফেলার কারণে পানি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
ভৈরব নদ বাঁচাও আন্দোলন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক ইকবাল কবির জাহিদ অভিযোগ করেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো জনস্বার্থের পরিবর্তে দুর্নীতিকেই উৎসাহিত করেছে।
তার ভাষায়, “ড্রেনের প্রস্থ কমিয়ে ও তলা উঁচু করে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান হয়নি। বরং ভবিষ্যতে নতুন প্রকল্পের সুযোগ তৈরি হয়েছে।”
তিনি বলেন, ভৈরব ও মুক্তেশ্বরী নদী এবং বিলহরিণা দখল হয়ে যাওয়ায় শহরের পানি বের হওয়ার স্বাভাবিক পথও বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রকৌশলী রুহুল আমিন মনে করেন, শহরের দক্ষিণাঞ্চলের পানি বিলহরিণা ও মুক্তেশ্বরী দিয়ে নিষ্কাশন এখন আর কার্যকর নয়। তাই নতুন সংযোগ খাল খননের মাধ্যমে পানি সরাসরি ভৈরব নদে প্রবাহিত করার উদ্যোগই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
যশোর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা জায়েদ হোসেন বলেন, শহরের আয়তন ও জনসংখ্যা বাড়লেও ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে গত দুই বছরে অধিকাংশ ড্রেন পরিষ্কার করায় আগের তুলনায় দ্রুত পানি নেমে যাচ্ছে।
তিনি জানান, পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের জলাবদ্ধতা নিরসনে পালবাড়ি মোড় থেকে চাঁচড়া মোড় পর্যন্ত সংযোগ খাল খননের কাজ চলছে এবং ইতোমধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, কেবল ড্রেন নির্মাণ নয়, খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার, নদী দখলমুক্ত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক ড্রেনেজ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া যশোর শহরের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

