মো. মিজানুর রহমান, কালকিনি (মাদারীপুর) প্রতিনিধি
মাত্র আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছিলেন এস এম তাইজুল ইসলাম। স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন মা হাওয়া বেগম। অভাবের সংসারে কখনো একবেলা খাবার জুটেছে, কখনো সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে না পেরে কেঁদেছেন। তবু হাল ছাড়েননি তিনি। একটাই স্বপ্ন ছিল—ছেলেকে পড়াশোনা করিয়ে একদিন বিচারকের আসনে বসাবেন।
মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তবে বিচারক হওয়ার পথটি তাইজুলের জন্য ছিল দীর্ঘ ও কঠিন। দারিদ্র্য, পিতৃহীন শৈশয় ও সংগ্রামের পর যখন স্বপ্নপূরণের পথে এগোচ্ছিলেন, তখনই জীবনে নেমে আসে বড় বিপর্যয়। একে একে অকেজো হয়ে যায় তাঁর দুই কিডনি। শুরু হয় নিয়মিত ডায়ালাইসিস। প্রয়োজন পড়ে কিডনি প্রতিস্থাপনের।
যে পরিবারে একবেলা খাবার জোগাড় করাই কঠিন ছিল, তাদের কাছে চিকিৎসার জন্য ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা জোগাড় করা ছিল প্রায় অসম্ভব। একসময় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন তাইজুল। তখন পাশে দাঁড়ান বন্ধু, সহপাঠী, বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। মায়ের অক্লান্ত চেষ্টা ও মানুষের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালে ভারতে গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করান তিনি।
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আবার পড়াশোনায় ফেরেন তাইজুল। দীর্ঘ লড়াই শেষে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ১২০তম স্থান অর্জন করে সিভিল জাজ হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। হাসপাতালের বিছানা থেকে বিচারকের আসনে পৌঁছানোর এ গল্পে রয়েছে এক মায়ের ত্যাগ, সন্তানের অদম্য চেষ্টা এবং মানুষের মানবিক সহযোগিতার স্মৃতি।
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার পূর্ব এনায়েতনগর ইউনিয়নের পূর্ব আলীপুর গ্রামের সন্তান তাইজুল ইসলাম। মাত্র আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর তিন সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব পুরোপুরি এসে পড়ে মা হাওয়া বেগমের ওপর।
সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন হাওয়া বেগম। কখনো মাঠে কাজ করেছেন, কখনো নিজের প্রয়োজনের কথা ভুলে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা নিয়েছেন নিজের ভাইদের কাছ থেকেও।
হাওয়া বেগম বলেন, “স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে অনেক কষ্ট করেছি। কখনো এমনও হয়েছে, ছেলেমেয়েদের মুখে খাবার দিতে পারিনি। আমার ভাইয়েরা তখন আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। মাঠে কাজ করেছি, পরিশ্রম করেছি। আমার একটাই স্বপ্ন ছিল—আমার ছেলে একদিন জজ হবে।”
প্রায় ৩১ বছর ধরে একাই সন্তানদের জন্য সংগ্রাম করেছেন এই মা। ছেলের বিচারক হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর সেই দীর্ঘ ত্যাগের যেন পূর্ণতা এসেছে।
অভাব-অনটনের মধ্যেও পড়াশোনায় মেধার স্বাক্ষর রাখেন তাইজুল। ২০০৮ সালে আলীপুর দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় গোল্ডেন এ+ অর্জন করেন তিনি। মাদ্রাসাটির ইতিহাসে তিনিই প্রথম গোল্ডেন এ+ পাওয়া শিক্ষার্থী।
পরে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন। ২০১০ সালের এইচএসসি পরীক্ষাতেও এ+ অর্জন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাক্রমে ৫৮তম স্থান অর্জন করে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ২০১৫ সালে এলএলবি এবং ২০১৮ সালে এলএলএম সম্পন্ন করেন তিনি।
তখন স্বপ্নের পথ অনেকটাই পরিষ্কার। কিন্তু এর মধ্যেই শুরু হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।
২০১৩ সাল থেকে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগতে শুরু করেন তাইজুল। প্রথমে কোমর ও পিঠে ব্যথা, পরে ২০১৫ সালে কিডনির সমস্যা ধরা পড়ে। একপর্যায়ে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর দুই কিডনিই অকেজো হয়ে গেছে।
শুরু হয় নিয়মিত ডায়ালাইসিস। বাড়তে থাকে চিকিৎসার ব্যয়। একপর্যায়ে চিকিৎসকেরা কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন। প্রয়োজন হয় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থার কারণে এই অর্থ জোগাড় করা ছিল দুঃসাধ্য।
তাইজুল বলেন, “আমার দুটি কিডনি যখন ড্যামেজ হয়ে গেল, তখন লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। আমি তখন অনার্স তৃতীয় বর্ষে। আমাদের ঘরে খাওয়ার মতো চালও থাকত না। এমন অবস্থায় ৩০ লাখ টাকা চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হলো। তখন মনে হয়েছিল, আমি হয়তো আর বাঁচব না, মায়ের স্বপ্নও পূরণ করতে পারব না।”
তাইজুলের অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়লে পাশে দাঁড়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, সহপাঠী, বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
ছেলের চিকিৎসার জন্য নিজের জমিজমা ও যা কিছু ছিল, তা বিক্রি করেও অর্থ জোগাড়ের চেষ্টা করেন হাওয়া বেগম। তাতেও প্রয়োজনীয় অর্থ পূরণ হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত মানুষের সহযোগিতায় চিকিৎসার অর্থ জোগাড় হয়। ২০১৭ সালে ভারতে গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় তাইজুলের।
হাওয়া বেগম বলেন, “আমার ছেলে এমন রোগে পড়েছিল যে মনে হয়েছিল, তাকে আর বাঁচাতে পারব না। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আর মানুষের সহযোগিতায় সে ফিরে এসেছে। আমার ছেলে আজ জজ হয়েছে। আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আল্লাহর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।”
সেই দুঃসহ সময়ের কথা মনে করে তাইজুল বলেন, “একদিকে আমার জীবন, অন্যদিকে আমার ক্যারিয়ার—সবকিছু শেষের দিকে চলে গিয়েছিল। তখন মনে হতো, আমি যদি মারা যাই, তাহলে কীভাবে জজ হব? এই চিন্তা আমাকে আরও ভেঙে দিত। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি।”
কিডনি প্রতিস্থাপনের পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে আবার পড়াশোনায় ফেরেন তিনি। শারীরিক নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকেন।
তাইজুল বলেন, “আমি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে ফিরেছি। আমার মা চেয়েছিলেন আমি জজ হই। বন্ধুবান্ধব, বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন—অনেকে আমাকে সহযোগিতা করেছেন। তাঁরা যদি সেদিন পাশে না দাঁড়াতেন, হয়তো আমি আজ এখানে থাকতাম না। আল্লাহর রহমতে আমি বেঁচে আছি এবং আজ জজ হতে পেরেছি। আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞ।”
অবশেষে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ১২০তম স্থান অর্জন করে সিভিল জাজ হিসেবে উত্তীর্ণ হন এস এম তাইজুল ইসলাম। তাঁর এ সাফল্যে একদিকে যেমন পূরণ হয়েছে মায়ের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, অন্যদিকে কঠিন অসুস্থতার মধ্যেও লক্ষ্য ধরে রাখার এক সংগ্রামী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে।

