জাবিপ্রবি প্রতিনিধি
সীমিত গবেষণার সুযোগ-সুবিধা ও ল্যাবরেটরির নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবিপ্রবি) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. এরশাদ আলী। স্নাতক পর্যায়েই আন্তর্জাতিক জার্নাল ও সম্মেলনে তাঁর ১৫টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় এমন সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে বর্তমানে চীনে সম্পূর্ণ স্কলারশিপ নিয়ে স্নাতকোত্তর করছেন তিনি।
গুগল স্কলার ও রিসার্চগেটের তথ্য অনুযায়ী, এরশাদের প্রকাশিত ১৫টি গবেষণাপত্রের মধ্যে ১২টি কিউ-১ (Q1) এবং দুটি কিউ-২ (Q2) ক্যাটাগরির জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। বাকি একটি আইইইই (IEEE) সম্মেলনের গবেষণাপত্র। তাঁর বর্তমান এইচ-ইনডেক্স ৬, যা গবেষণাক্ষেত্রে তাঁর কাজের প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতার একটি সূচক। স্নাতকের শেষ বর্ষে থিসিসের মাধ্যমে গবেষণায় যুক্ত হওয়ার পর থেকেই তিনি এ ক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাড়িয়ে চলেছেন।
বর্তমানে এরশাদ চীনের হুবেই ইউনিভার্সিটি অব অটোমোটিভ টেকনোলজিতে (HUAT) ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট স্কলারশিপের আওতায় অপটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন। তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র অ্যাডভান্সড ম্যাটেরিয়ালস, সেমিকন্ডাক্টর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি। বিশেষ করে পেরোভস্কাইট ও অ্যান্টি-পেরোভস্কাইট পদার্থের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ এবং সৌরকোষে এসব পদার্থের ব্যবহার নিয়ে কাজ করছেন তিনি।
গবেষণার অংশ হিসেবে সোডিয়াম থ্রি সালফার ব্রোমাইড (Na₃SBr) ব্যবহার করে একটি অ্যান্টি-পেরোভস্কাইট সৌরকোষের তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করেছেন এরশাদ। কম্পিউটেশনাল মডেলে ওই কাঠামোর পাওয়ার কনভারশন এফিশিয়েন্সি (PCE) প্রায় ২৭ শতাংশ পাওয়া গেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে নতুন উপাদানের সম্ভাবনা অনুসন্ধানে তাঁর এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকীগুলোতেও কাজের সুযোগ পেয়েছেন এরশাদ। তিনি ‘জার্নাল অব পাওয়ার সোর্সেস’, ‘জার্নাল অব অ্যালয়স অ্যান্ড কম্পাউন্ডস’ এবং ‘নেক্সট ম্যাটেরিয়ালস’-এর মতো জার্নালে পিয়ার রিভিউয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া জাপান অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (JAEA) থেকে ‘পার্টিকল অ্যান্ড হেভি আয়ন ট্রান্সপোর্ট কোড সিস্টেম’ (PHITS) ব্যবহারের অনুমোদিত লাইসেন্স পেয়েছেন তিনি।
উচ্চশিক্ষার জন্য চীনকে বেছে নেওয়ার কারণ সম্পর্কে এরশাদ বলেন, “চীনের প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণার সমন্বিত পরিবেশ আমাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছে। হুবেই ইউনিভার্সিটির অটোমোটিভ গবেষণার সঙ্গে ম্যাটেরিয়ালস ও জ্বালানিবিজ্ঞানের দারুণ একটা সংযোগ রয়েছে, যা আমার কাজের পরিধি বাড়াতে সাহায্য করছে।”
স্নাতকোত্তর শেষ করে পিএইচডি করার পরিকল্পনা রয়েছে এরশাদের। ভবিষ্যতে টেকসই জ্বালানি ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি নিয়ে আরও বড় পরিসরে গবেষণা করতে চান তিনি।
এরশাদের এই অর্জনে গর্বিত তাঁর গবেষণা সুপারভাইজার ও জাবিপ্রবির ইইই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মাহফুজুল হক। তিনি বলেন, “নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে এরশাদকে অনেক সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সেই জায়গা থেকে তাঁর আজকের এই অর্জন আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। সে আমাদের প্রমাণ করে দিয়েছে—শুধু সিজিপিএ দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় না। মেধা, পরিশ্রম, আগ্রহ এবং লক্ষ্যের প্রতি অটল থাকার মানসিকতাই তাকে এত দূর নিয়ে এসেছে।”
গবেষণার পথচলায় দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য জাবিপ্রবির ইইই বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. রাশিদুল ইসলাম, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ুন কবির এবং ইইই বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. সিজার রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন এরশাদ।
উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “উচ্চশিক্ষা বা স্কলারশিপের প্রস্তুতি স্নাতক শেষে নয়, বরং শুরু থেকেই নেওয়া উচিত। ভালো সিজিপিএর পাশাপাশি গবেষণার অভিজ্ঞতা, বৈজ্ঞানিক লেখালেখি, প্রোগ্রামিং, তথ্য বিশ্লেষণ এবং যোগাযোগদক্ষতা বাড়ানো খুব জরুরি। আর গবেষণায় ব্যর্থতা বা প্রত্যাখ্যান আসবেই, সেটাকে শিক্ষার অংশ হিসেবে নিয়ে ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে হবে।”
এরশাদের এই অর্জন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছে। সীমিত সুযোগের মধ্যেও অধ্যবসায়, গবেষণার প্রতি আগ্রহ ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে গেলে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের অবস্থান তৈরি করা সম্ভব—তাঁর পথচলা সেই বার্তাই দিচ্ছে।

