মো. সাদ্দাম হোসেন, সিলেট প্রতিনিধি
সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) শের মাহবুব মুরাদ এবং কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আজিজুন্নাহারকে বদলি করা হয়েছে। সাদাপাথরে ব্যাপক লুটপাটের ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যর্থতা ও উদাসীনতার অভিযোগ ওঠে।
সিলেটের জাফলং ও সাদাপাথর এলাকায় পাথর লুট নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার মধ্যেই জেলা প্রশাসককে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার (১৮ আগস্ট) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে সিলেটের নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারোয়ার আলম।
শের মাহবুব মুরাদ ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সিলেটের ডিসি হিসেবে যোগদান করেন। তার দায়িত্বকালে গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ এবং সাদাপাথর থেকে পাথর ও বালু লুটের অভিযোগ ওঠে।
সাদাপাথরে নজিরবিহীন লুটপাটের ঘটনা দেশব্যাপী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এরপর থেকেই প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
রোববার পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, পাথর লুটে স্থানীয় প্রশাসনের দায় রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার এই বক্তব্যের পরদিনই জেলা প্রশাসককে বদলি করা হয়।
এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তারাও সাদা পাথর এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন।
জেলা প্রশাসক শের মাহবুব মুরাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
একই দিন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজাউন নবীর স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে কোম্পানীগঞ্জের ইউএনও আজিজুন্নাহারকে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় বদলি করা হয়। আর ফেঞ্চুগঞ্জের ইউএনও মো. শফিকুল ইসলামকে কোম্পানীগঞ্জে পদায়ন করা হয়েছে।
আজিজুন্নাহার ২০২৫ সালের ১৪ জানুয়ারি কোম্পানীগঞ্জে যোগ দেন। এরপর ভোলাগঞ্জ ও সাদাপাথরে ব্যাপক লুটপাট হয়, যা নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা হয়। সমালোচনার মুখে ১২ আগস্ট ডিসি শের মাহবুব মুরাদ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কিন্তু ওই কমিটিতে ইউএনও আজিজুন্নাহারকেও রাখা হয়, যিনি নিজেই লুট ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
সারা দেশে ৫১টি পাথর কোয়ারি থাকলেও সিলেট অঞ্চলে রয়েছে আটটি। এর বাইরেও সাদাপাথর, জাফলং, বিছনাকান্দি, উৎমাছড়া প্রভৃতি এলাকায়ও পাথর রয়েছে, যা মূলত পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেই পরিচিত। এসব জায়গায় ভারতের পাহাড়ি নদী থেকে পাথর আসে। পরিবেশগত কারণে ২০২০ সালের পর এসব কোয়ারি আর ইজারা দেওয়া হয়নি।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর ও রেলওয়ের ১০ একরের বাঙ্কার এলাকায় ভয়াবহ লুটপাট শুরু হয়। প্রশাসনের সামনেই প্রথমে রাতে, পরে দিনে-রাতেই লুট চলে। বর্তমানে সাদাপাথর এলাকায় পাথরের কোনো অস্তিত্ব নেই, আর রেলওয়ে বাঙ্কার এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ।
স্থানীয়দের মতে, ভোলাগঞ্জ ও সাদাপাথর এলাকা থেকে প্রায় দেড় কোটি ঘনফুট পাথর লুট হয়েছে, যার বাজারমূল্য ২০০ কোটি টাকারও বেশি।
তাদের অভিযোগ, ইউএনও আজিজুন্নাহার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনের অভিযান আরও শিথিল হয়ে পড়ে। এতে করে লুটপাটকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাই তদন্ত কমিটিতে তার উপস্থিতিকে অনেকেই হাস্যকর বলে মন্তব্য করেছেন।
গত ১৩ আগস্ট সাদাপাথর এলাকা পরিদর্শন শেষে দুদকের সিলেট কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রাফি মো. নাজমুস সাদাত বলেন, এখানে স্থানীয় প্রশাসন আরও সতর্ক থাকতে পারত। তাদের আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা দরকার ছিল।

