সাইফুল ইসলাম,বাবুগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার একটি সরকারি কলেজে টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়াই সরকারি মালামাল বিক্রির অভিযোগ উঠেছে কলেজ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে। একই ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে শিক্ষকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, কলেজটির তিনতলা ভবনের তৃতীয় তলা পরিত্যক্ত ঘোষণা করে ভেঙে ফেলা হয়। পরে ভবনের ছাদের পুরাতন রড, স্টোরে রক্ষিত লোহার রড, ঢেউটিন এবং পুরাতন দরজা-জানালাসহ বিভিন্ন মালামাল স্থানীয় ভাঙারি ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ৯৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো উন্মুক্ত টেন্ডার বা নিলাম প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
গত ১৪ মে বিকেলে বিক্রয়কৃত মালামাল কলেজ ক্যাম্পাস থেকে পিকআপযোগে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সন্ধ্যা হয়ে গেলে মালামাল ট্রাকে তোলার বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে।
অভিযোগ রয়েছে, পরে দেহেরগতি ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সরোয়ার হাওলাদার ও বাস্তুহারা দলের দেহেরগতি ইউনিয়ন সভাপতি মো. সোহাগ হাওলাদার রাত সাড়ে আটটার দিকে কলেজ সড়কে মালামালবোঝাই ট্রাকটি আটকে দেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন কলেজের সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম ও প্রভাষক মো. সেলিম হোসেন। এ সময় স্থানীয় নেতারা টেন্ডার ছাড়া সরকারি মালামাল বিক্রির বিষয়ে কৈফিয়ত চান এবং পরে শিক্ষকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম অভিযোগ করে বলেন, “বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে দেহেরগতি ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সরোয়ার হাওলাদার আমাদের কাছ থেকে নগদ ৪৫ হাজার টাকা নিয়ে যান।”
অন্যদিকে মালামাল ক্রেতা ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, তাকেও ভয়ভীতি দেখিয়ে অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে।
এ ঘটনায় কলেজ প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কলেজ অধ্যক্ষ মো. শামীম হোসেন সাংবাদিকদের জানান, তিনি বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন। কলেজ ক্যাম্পাসে পড়ে থাকা পুরাতন মালামাল শিক্ষার্থীদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছিল। আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষা সামনে রেখে কলেজ কর্তৃপক্ষ রেজুলেশনের মাধ্যমে মালামাল বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। বিক্রির অর্থ সরকারি রাজস্ব খাতে জমা দেওয়া হবে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে তিনি আরও বলেন, “একটি চক্র ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নিয়ে আমার শিক্ষকদের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
প্রভাষক সেলিম হোসেন বলেন, “রেজুলেশন অনুযায়ী মালামাল বিক্রি করা হয়েছে। ক্রেতা মালামাল নিতে এলে আমরা উপস্থিত থেকে বুঝিয়ে দিই। তখন স্থানীয় কয়েকজন এসে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করে। এ সময় স্থানীয় সোহাগ হাওলাদার উপস্থিত ছিলেন।”
অভিযোগের বিষয়ে দেহেরগতি ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার হাওলাদারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দেননি। অপরদিকে বাস্তুহারা দলের ইউনিয়ন সভাপতি সোহাগ হাওলাদার অভিযোগ অস্বীকার করলেও ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি কলেজের কোনো ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা কিংবা ভবন ভেঙে পাওয়া মালামাল বিক্রির ক্ষেত্রে নির্ধারিত সরকারি নীতিমালা অনুসরণ বাধ্যতামূলক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে মূল্য নির্ধারণের পর উন্মুক্ত নিলাম বা টেন্ডারের মাধ্যমে মালামাল বিক্রির বিধান রয়েছে। সরাসরি ব্যক্তি পর্যায়ে সরকারি মালামাল বিক্রির সুযোগ নেই বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছেন। সরকারি কলেজের মালামাল টেন্ডার ছাড়া বিক্রির এখতিয়ার কলেজ কর্তৃপক্ষের আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অনিয়ম আরও বাড়বে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে শিক্ষকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা আইনশৃঙ্খলার জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করবে।
নিজ দলের নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক সুলতান আহমেদ খান বলেন, “বিষয়টি লিখিতভাবে অভিযোগ আকারে পেলে দলীয়ভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো ব্যক্তি দলের নাম ব্যবহার করে অপকর্ম করলে তার দায় দল নেবে না।”

