যশোর প্রতিনিধি
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাট। সারা বছর চামড়া বেচাকেনা হলেও কোরবানির ঈদকে ঘিরেই জমে ওঠে এ বাজার। তবে এবার ঈদের আগেই নানা সংকটে হতাশ হয়ে পড়েছেন ক্ষুদ্র, মাঝারি ও মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপকরণ লবণের দাম বৃদ্ধি, ট্যানারি মালিকদের কাছে কোটি কোটি টাকা বকেয়া, ব্যাংক ঋণের অভাব এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার আশঙ্কায় তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে উদ্বেগ।
জানা গেছে, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকার কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে। ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। অন্যদিকে ঢাকার বাইরে গরুর প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা।
তবে সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া বেচাকেনা হবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, নানা সংকটের কারণে এবার কোরবানির মৌসুমে চামড়ার বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রাজারহাট মোকামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বলেন, “পশুর চামড়া সংরক্ষণের অন্যতম উপকরণ লবণ। ইতোমধ্যে প্রতি বস্তা লবণের দাম ১০০ টাকা বেড়েছে। এতে চামড়া সংরক্ষণের খরচ বাড়ছে। সরকারিভাবে বিনামূল্যে লবণ দেওয়া হলেও ব্যবসায়ীরা তা পান না। মাদরাসা ও এতিমখানায় দেওয়া লবণ অনেক সময় বিক্রি হয়ে যায়। ব্যবসায়ীদের সরাসরি লবণ দিলে আমরা উপকৃত হতাম।”
আরেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আনন্দ দাস বলেন, “আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা নেই। বাধ্য হয়ে এনজিও বা মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়। সেই পুঁজি দিয়ে চামড়া কিনেও ন্যায্যমূল্য পাই না। কোরবানির সময় সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া বিক্রি করতে পারি না।”
রাজারহাট মোকামের আড়তদার আবদুল মালেক বলেন, “ট্যানারি মালিকদের কাছে আড়তদারদের কোটি কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। দীর্ঘদিনেও সেই বকেয়া আদায় না হওয়ায় পুঁজি সংকট তৈরি হয়েছে। ঈদের আগে টাকা না পেলে ব্যবসা চালানো কঠিন হবে।”
একাধিক ব্যবসায়ী জানান, সরকার প্রতি বছর চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও কার্যকর মনিটরিং না থাকায় বাস্তবে সেই দাম কার্যকর হয় না। এছাড়া চামড়া পাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির দাবি জানান তারা।
তাদের মতে, দেশের চামড়া শিল্পকে শুধু চীনা বাজারের ওপর নির্ভরশীল না রেখে ইউরোপের বাজারেও রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে হবে। তাহলে চামড়া শিল্পে গতি ফিরবে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারবেন।
যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, “চামড়ার বাজার মনিটরিং ও পাচার রোধে জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নিয়েছে।”
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহের প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার রাজারহাটে যশোরসহ খুলনা বিভাগের ১০ জেলার পাশাপাশি ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, ঝালকাঠি, রাজশাহী, পাবনা, ঈশ্বরদী ও নাটোরের ব্যবসায়ীরা চামড়া কেনাবেচা করেন। ছোট-বড় মিলিয়ে এখানে প্রায় ২০০টির বেশি আড়ত রয়েছে, যেখানে অন্তত দুই হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

