রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
খুলনা নগরীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ‘জুন ক্লোজিং’কে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। নগরীর ১২৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছ থেকে খেলার ঘাটতি, এজি অফিসের ব্যয়, বিদায় সংবর্ধনা ও বই পরিবহনের মতো নানা অজুহাতে টাকা সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক শিক্ষক।
সম্প্রতি সোনাপোতা ক্লাস্টারের একটি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে দেওয়া বার্তা ঘিরে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক সমাজে আলোচনা শুরু হয়। সেখানে খানজাহান আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রশান্ত রায় লিখেছেন, “দ্রুত জমা দিন। কারণ জুন ক্লোজিং। অন্যান্য ক্লাস্টার আজ জমা দেবে। সব ক্লাস্টারের একত্র করে আমাদের বিল-ভাউচার পাশ করাতে হবে। প্রতি বছর আমরা দিয়ে থাকি, এটা সবাই অবগত।”
অভিযোগ রয়েছে, সোনাপোতা ক্লাস্টারে অর্থ সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করছেন প্রশান্ত রায়। টাকা পাঠানোর জন্য যে বিকাশ নম্বর ব্যবহার করতে বলা হয়েছে, সেটি আব্দুল গণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুজিবুর রহমানের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক দাবি করেন, খুলনা সদর এলাকার সাতটি ক্লাস্টারের আওতাধীন ১২৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অর্থ আদায় চলছে। তাদের অভিযোগ, কয়েকজন শিক্ষক নেতা ও সংশ্লিষ্ট কিছু শিক্ষা কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মহেশ্বরপাশা কেএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আনিসুজ্জামান এবং মহেশ্বরপাশা বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এস কে জামানের নামও অভিযোগে এসেছে।
শিক্ষকদের ভাষ্য, প্রতিবাদ করলে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কায় অধিকাংশ শিক্ষক বাধ্য হয়ে টাকা দেন। তাদের দাবি, আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ শিক্ষক নেতাদের কাছে থাকলেও বাকি অর্থ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, খুলনা সদর এলাকায় সোনাপোতা, সোনাডাঙা, বীনাপানি, ফুলবাড়ী বিকে, আব্দুল বারী, স্যাটেলাইট টাউন ও দক্ষিণ টুটপাড়া—এই সাতটি ক্লাস্টারের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এসব ক্লাস্টারের দায়িত্বে রয়েছেন সহকারী থানা শিক্ষা কর্মকর্তারা।
অভিযোগ অনুযায়ী, সম্প্রতি খেলার ঘাটতি ও এজি অফিসের ব্যয় দেখিয়ে প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে ৫০০ টাকা করে সংগ্রহ করা হয়েছে। এর আগে গত ৮ এপ্রিল একই খাতে ২০০ টাকা এবং গোল্ডকাপ ফুটবল আয়োজনের জন্য প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে ৪০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া দুই অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিদায় সংবর্ধনার জন্য ১৬০ জনের বেশি শিক্ষকের কাছ থেকে ৩০০ টাকা করে এবং বই পরিবহনের জন্য বিভিন্ন সময়ে ১০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
এ বিষয়ে সহকারী শিক্ষক মুজিবুর রহমান প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরে বলেন, খেলার ঘাটতি ও এজি অফিস বাবদ অর্থ নেওয়ার আলোচনা হয়েছিল। তবে কিছু জটিলতার কারণে তা আর এগোয়নি। তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে প্রধান শিক্ষক প্রশান্ত রায়ের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
চাঁদা আদায়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে সোনাপোতা ক্লাস্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী থানা শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, “ক্লাস্টারে খেলার জন্য চার হাজার টাকা করে বরাদ্দ ছিল। সেই বরাদ্দ দিয়েই কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।”
থানা শিক্ষা কর্মকর্তা (টিইও) মো. শাহজাহান বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। অভিযোগের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ অহিদুল আলম বলেন, “জেলা অফিসে কোনো ধরনের ঘুষ বা চাঁদাবাজির সুযোগ নেই। লিখিত অভিযোগ বা প্রমাণ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে এ নিয়ে শিক্ষক সমাজে অসন্তোষ বাড়ছে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

