খুলনা প্রতিনিধি
সুন্দরবন ঘিরে গড়ে ওঠা ইকো-রিসোর্টগুলো খুলনার দাকোপ উপজেলার স্থানীয় মানুষের জীবিকায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। পর্যটকদের খাবার সরবরাহ, নৌকা চালানো, পরিবহন ও রিসোর্টে চাকরিসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ১৫টি রিসোর্ট বন্ধের নির্দেশের পর এ পর্যটনশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব রিসোর্টের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় দুই হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২১ সাল থেকে দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জ ও বাণীশান্তা ইউনিয়নের তিনটি গ্রামে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে ১৫টি ইকো-রিসোর্ট গড়ে ওঠে। সুন্দরবনের ভেতরে নয়, বনসংলগ্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠিত এসব রিসোর্টে প্রতিটিতে আট থেকে ২০ জন পর্যন্ত কর্মী কাজ করছেন। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য খাবার সরবরাহ, নৌকা ও স্থানীয় যানবাহনের ব্যবস্থা করে আয় করছেন অনেকে। এতে স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ী ও সেবাদানকারীরাও উপকৃত হচ্ছেন।
ইরাবতী ইকো-রিসোর্ট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের ব্যবস্থাপক পলাশ মণ্ডল বলেন, আগে জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভর করতে হতো। ইকো-রিসোর্ট গড়ে ওঠায় স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন আগের মতো বনের সম্পদ আহরণের ওপর নির্ভর করতে হয় না। এসব রিসোর্ট ঘিরে মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
রিসোর্ট ওনার অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (রোয়াস) সভাপতি ইমন ইসলাম বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের বন্ধের নির্দেশের বিষয়টি তাঁরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। তবে এ বিষয়ে তাঁদের কাছে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি আসেনি। তাঁরা আইনগতভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করে রিসোর্টগুলো পরিচালনা করতে চান। তাঁর মতে, এসব রিসোর্ট স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে ভূমিকা রাখছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, পরিবেশবান্ধব পর্যটনশিল্প দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। তবে সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল প্রাকৃতিক পরিবেশে পর্যটন পরিচালনার ক্ষেত্রে বনের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সুন্দরবন ভ্রমণের নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ এবং যথাযথ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। এ জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, পর্যটনসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও রিসোর্ট উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। পরিবেশগত শর্ত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সুরক্ষা নিশ্চিত করে রিসোর্ট পরিচালনার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে একদিকে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে সচল থাকবে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতি।

