দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সেতুর অভাবে চরম ভোগান্তির মধ্যে জীবনযাপন করছেন রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ। বারবার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে ভাগজোত ও সুকারঘাটে দুটি সেতু নির্মাণ না হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় পিছিয়ে রয়েছে পুরো জনপদ।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীবেষ্টিত রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়ন। শুষ্ক মৌসুমে এখানকার মানুষকে পায়ে হেঁটে, গরু-মহিষ কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে চলাচল করতে হয়। আর বর্ষা ও বন্যার সময়ে নৌকাই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা। ফলে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত এবং কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচন এলেই উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু ভোট শেষ হলে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো আর বাস্তবায়নের মুখ দেখে না। আধুনিক নাগরিক সুবিধা থেকে এখনও বঞ্চিত সীমান্তবর্তী এ দুই ইউনিয়নের মানুষ।
উপজেলা প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা গেছে, রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ভাগজোত ঘাটে ৩৫০ মিটার এবং চিলমারী ইউনিয়নের সুকারঘাটে ৯৬ মিটার দীর্ঘ দুটি সেতু নির্মাণের জন্য সম্প্রতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বরাদ্দ চেয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-১ আসনের প্রার্থীদের অন্যতম প্রতিশ্রুতিও ছিল এই দুটি সেতু নির্মাণ।
স্থানীয় শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান বলেন, “আমি বর্তমানে ঢাকায় একটি কলেজে পড়াশোনা করছি। কিন্তু ছোটবেলায় বন্যার সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারতাম না। অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা মাঝপথেই বন্ধ হয়ে যায়। দ্রুত সেতু নির্মাণ হলে এ অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি হবে।”
ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “ভাগজোত ও সুকারঘাটে দুটি সেতু আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষা, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত সেতু নির্মাণ প্রয়োজন।”
স্থানীয় শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, “বন্যার সময় স্কুল ও রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে যায়। বছরে প্রায় ছয় মাস শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে অনেক শিক্ষক এখানে চাকরি করতে চান না। স্বাস্থ্যসেবার অবস্থাও নাজুক। উপজেলা সদর হাসপাতাল অনেক দূরে হওয়ায় সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে অনেক রোগী বিপদে পড়েন।”
তিনি আরও বলেন, কৃষকদেরও অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় গুনতে হয়। নৌকা বা ঘোড়ার গাড়িতে করে ফসল বাজারে নিতে গিয়ে ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হন তারা।
দৌলতপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. আসাদুল্লাহ বাচ্চু বলেন, “সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ অনুমোদন পেলেই নিয়ম অনুযায়ী কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।”
কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, “ভাগজোত ও সুকারঘাটে সেতু নির্মাণ এবং নদীভাঙন রোধ আমার এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমি বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করেছি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটারও দিয়েছি। দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
স্থানীয়দের আশা, দীর্ঘদিনের অবহেলার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত সেতু দুটি নির্মাণ করা হলে বদলে যাবে সীমান্তবর্তী দুই ইউনিয়নের জীবনচিত্র। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষিখাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। তবে বছরের পর বছর প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে এখন আর আশ্বাসে বিশ্বাসী নন চরাঞ্চলের মানুষ; তারা চান বাস্তব পদক্ষেপ ও দৃশ্যমান উন্নয়ন।

