অশোক মুখার্জি, কলাপাড়া(পটুয়াখালী)প্রতিনিধি
সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও প্রচলিত আইন অমান্য করে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর, আলীপুর, কুয়াকাটা ও আশাখালী মৎস্যবন্দর সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে অবাধে চলছে অবৈধ ও রূপান্তরিত ট্রলিং বোটের কার্যক্রম। নিষিদ্ধ অতি ক্ষুদ্র ফাঁসের জাল এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছের পোনা, রেণু, ডিমওয়ালা মা মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ির পোনা ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী নির্বিচারে আহরণের অভিযোগ উঠেছে। এতে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
স্থানীয় জেলে ও মৎস্যসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মহিপুর-আলীপুর এলাকায় গত বছর যেখানে ৪০-৪৫টি রূপান্তরিত ট্রলিং বোট চলাচল করত, সেখানে চলতি বছর এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬০টিতে পৌঁছেছে। দ্রুত অধিক মুনাফার আশায় সাধারণ কাঠের ট্রলারকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার অনুমতি থাকলেও এসব ট্রলিং বোট উপকূলীয় অগভীর জলসীমায় প্রবেশ করে মাছ শিকার করছে। এতে উপকূলীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র ও অভয়াশ্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রলিং বোটে ব্যবহৃত ‘বটম ট্রলিং’ পদ্ধতি সমুদ্রের তলদেশের প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস, শামুক-ঝিনুকের আবাসস্থলসহ গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করে। পাশাপাশি ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস, রাডার, ইকো সাউন্ডার ও উইঞ্চ মেশিনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ব্যাপক হারে মাছ আহরণ সম্ভব হচ্ছে, যা ক্ষুদ্র জেলেদের জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
মহিপুর ও আলীপুরের জেলেরা অভিযোগ করেন, বড় ট্রলিং বোটগুলো প্রায়ই তাদের জালের ওপর দিয়ে চলাচল করায় জাল ছিঁড়ে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। প্রতিবাদ করলে হুমকি-ধমকিরও শিকার হতে হয় বলে তারা জানান।
স্থানীয় জেলে আনোয়ার হোসেন বলেন, “আমরা দিনের পর দিন সমুদ্রে গিয়েও মাছ পাচ্ছি না। অথচ কিছু প্রভাবশালী ট্রলার মালিক অবৈধ ট্রলিংয়ের মাধ্যমে মাছ ও পোনা নিধন করছে। প্রশাসন চাইলে একদিনেই এটি বন্ধ করতে পারে।”
আরেক জেলে আবুল কাশেম বলেন, “ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে জেলেদের মাছ ধরার মতো কিছুই থাকবে না।”
এদিকে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং নৌ পুলিশের একটি অংশের পরোক্ষ সহযোগিতায় বছরের পর বছর অবৈধ ট্রলিং চলছে বলে জেলেদের অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মহিপুর মৎস্য আড়ৎ মালিক সমিতির সহ-সভাপতি রাজু আহমেদ রাজা বলেন, “অবৈধ ট্রলিং বন্ধে একাধিকবার আলোচনা হলেও কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ছাড়া এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।”
ফিশারিজ কর্মকর্তা বখতিয়ার আহমেদ বলেন, “অবৈধ জালের কারণে ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা নিধন হচ্ছে। এতে মাছের উৎপাদন কমছে এবং মৎস্যসম্পদ হুমকির মুখে পড়ছে। তাই কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।”
কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মনিরুজ্জামান বলেন, “ট্রলিং বোট নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। অবৈধ মৎস্য শিকার ও নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে আমরা তৎপর আছি। তবে গভীর সমুদ্রে অভিযান পরিচালনায় কিছু লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।”
পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, সংশ্লিষ্ট সংস্থা, জনপ্রতিনিধি ও জেলে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করা হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অবৈধ ট্রলিং দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় মানুষের জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।

