যশোর প্রতিনিধি
দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও স্মৃতিবিজড়িত মণিহার সিনেমা হল ভাঙার খবরে শোকাহত যশোরবাসী। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও বিনোদনের প্রতীক হিসেবে খ্যাত এই সিনেমা হলটি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে—এমন সংবাদে অগণিত মানুষের হৃদয়ে এখন বুকভাঙা কষ্ট।
১৯৮২ সালে যশোরের ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলামের উদ্যোগে নির্মিত হয় আধুনিক স্থাপত্যশৈলির মণিহার সিনেমা হল। স্থপতি কাজী মোহাম্মদ হানিফের নকশায় নির্মিত চারতলা এই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হলের শোভাবৃদ্ধির কাজ করেন চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান। ১ হাজার ৪৩০ আসনের বিশাল এই সিনেমা হলটি একসময় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা হল হিসেবে খ্যাতি পায়।
১৯৮৩ সালের ৮ ডিসেম্বর সোহেল রানা ও সুচরিতা অভিনীত ‘জনি’ চলচ্চিত্র দিয়ে যাত্রা শুরু করে মণিহার। টিকিট পেতে লম্বা লাইনে দাঁড়ানো, ব্ল্যাকারদের কাছে চড়া দামে টিকিট কেনা, এমনকি চোখে গুল ছিটিয়ে টিকিট ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও ছিল তৎকালীন সময়ে আলোচনার বিষয়। যশোরবাসীসহ সারা দেশের দর্শকদের কাছে মণিহারে সিনেমা দেখা মানে ছিল এক ধরনের স্বপ্নপূরণ।
মণিহারের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ঝিকরগাছার আবু কালাম বলেন, “টিকিট পাওয়া ছিল সোনার হরিণের মতো। একবার ভেতরে ঢুকতে পারলেই মনে হতো জীবন সার্থক।” একইভাবে রঘুরামপুরের শাহজান আলী জানান, “ভারতের বশিরহাট থেকেও আত্মীয়রা আসতেন শুধু মণিহারে ছবি দেখতে।”
প্রবীণ দর্শক বিনান্ত চৌধুরীর স্মৃতিতে ভেসে আসে গরুর গাড়িতে চড়ে দলবেঁধে মণিহারে এসে সিনেমা দেখার গল্প। তিনি বলেন, “দিনের দিন টিকিট না পেয়ে আমরা সিটি কলেজ মাঠে রাত কাটাতাম। পরদিন সিনেমা দেখে হৈ-হল্লা করে ফিরতাম।”
তবে সময়ের পালাবদলে ভালো মানের সিনেমার অভাব ও লোকসানের কারণে হলটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি বলে জানান প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল ইসলামের ছেলে ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মিঠু। তিনি বলেন, “মাসে কেবল বিদ্যুৎ বিলই আসে এক থেকে দেড় লাখ টাকা। ২৫ জন স্টাফসহ এত বড় হল চালানো যাচ্ছে না। তাই নতুন করে মার্কেট ও আবাসিক হোটেল নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। তবে এখানে ছোট আকারের সিনেপ্লেক্স রাখার চিন্তাও আছে।”
মণিহার শুধু একটি সিনেমা হল ছিল না—যশোরের শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। নিপুণ কারুকাজ, মনোমুগ্ধকর নকশা আর মানুষের হৃদয়ের স্মৃতির ভাণ্ডার হয়ে থাকা এই মণিহার ভাঙার খবরকে অনেকেই ‘যশোরের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

