যশোর প্রতিনিধি
যশোর জেলায় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) টিকার তীব্র সংকটে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে ৭৩ হাজার ৩১৭ জন শিশু। এর মধ্যে নবজাতকের সংখ্যা এক হাজার ৭২২ জন। গত তিন মাস ধরে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে জীবনরক্ষাকারী টিকার সরবরাহ না থাকায় নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা। এতে অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়ায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে হাম, পোলিও, নিউমোনিয়ার মতো প্রাণঘাতী রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। সময়মতো টিকা না পেলে ভবিষ্যতে পঙ্গুত্বসহ নানা জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গত ৪ মে থেকে ৭ মে পর্যন্ত যশোর সদরসহ জেলার সাতটি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, জেলার ২ হাজার ২৮৩টি অস্থায়ী ও ৮টি স্থায়ী টিকাকেন্দ্রে ইপিআই টিকার সরবরাহ নেই। কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রেহেনেওয়াজ রনি জানান, সময়মতো টিকা দিতে না পারায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং তারা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, গত তিন মাসে যশোর জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও দুটি বেসরকারি ক্লিনিকে মোট ১ হাজার ৭২২ জন নবজাতকের জন্ম হয়েছে। এছাড়া নিয়মিত টিকা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে আরও ৫৯ হাজার ৮৭৩ শিশু। বেসরকারি ক্লিনিক ও বাসাবাড়িতে জন্ম নেওয়া নবজাতকদের সংখ্যা যুক্ত হলে এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সদর উপজেলার বসুন্দিয়া ঘোপেরডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা সানজিদা আক্তার বলেন, দুই মাসের নাতিকে টিকা দেওয়ার জন্য কয়েকবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়েও ফিরে আসতে হয়েছে। প্রতিবারই আগামী মাসে আসতে বলা হচ্ছে।
রুপদিয়া জিরাট গ্রামের আবুবক্কর জানান, গত ৫ মে যশোর জেনারেল হাসপাতালে তার নাতনির জন্ম হয়েছে। চিকিৎসক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিসিজি টিকা দিতে বললেও এখনও টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগী একাধিক অভিভাবক জানান, ফেব্রুয়ারি থেকে বারবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়েও টিকা পাওয়া যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যকর্মীরা সরবরাহ না থাকার কথা বলে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। বেসরকারিভাবে এসব টিকার খরচ অনেক বেশি হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য তা বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সদর উপজেলার স্বাস্থ্যকর্মী (এমটিপি) ওহেদুজ্জামান সুমন বলেন, কয়েক মাস ধরে টিকা নেই। জেলা ইপিআই কেন্দ্রে চাহিদাপত্র পাঠানো হলেও এখনো সরবরাহ পাওয়া যায়নি।
চৌগাছা উপজেলার স্বাস্থ্যকর্মী নিত্যপদ পাল জানান, গত তিন মাসে পর্যায়ক্রমে প্রায় সব ধরনের ইপিআই টিকা শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে শুধু আইপিভি টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
যশোর মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মাহাবুবুর রহমান এবং শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মাহাফুজুর রহমান বলেন, নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সময়মতো ডোজ সম্পন্ন না হলে শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়বে এবং ভবিষ্যতে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
সিভিল সার্জন অফিসের ইপিআই স্টোরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পিসিভি ও পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা শেষ হয়ে যায়। ১০ মার্চ শেষ হয় বিসিজি, ওপিভি ও আইপিভি টিকা। ১৪ এপ্রিল শেষ হয় এমআর টিকা এবং গত বছরের নভেম্বর থেকে টিসিভি টিকা নেই।
ইপিআই কর্মসূচির তত্ত্বাবধায়ক রবিউল ইসলাম জানান, স্টোরে বর্তমানে কোনো টিকা নেই। কেন্দ্রীয়ভাবে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। টিকা সরবরাহ পেলেই দ্রুত জেলার সব কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হবে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়েত বলেন, গত ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে হাসপাতালে টিকা সংকট চলছে। ফলে নবজাতকদের প্রয়োজনীয় টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা জানান, বিভিন্ন জেলা থেকে সীমিত পরিমাণ টিকা সংগ্রহ করে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা চলছে। কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ পাওয়া গেলে দ্রুত এই সংকট কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

