কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি
নিজের বাড়ি ও জমি থাকা সত্ত্বেও প্রায় আড়াই বছর ধরে ভাড়া ঘরে বসবাস করছেন নেত্রকোনার কেন্দুয়ার এক দম্পতি। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে দুই দফা হামলা, গুরুতর জখম, ভাঙচুর ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে করা মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি করেছেন মামলার বাদী আঃ বারেক।
ভুক্তভোগী দম্পতির অভিযোগ, মামলার আসামিরা জামিনে থাকার সুযোগে তাঁদের বসতভিটা দখলে রেখেছেন। নিজের বাড়িতে ফিরতে গেলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এ কারণে স্ত্রীকে নিয়ে প্রায় আড়াই বছর ধরে কেন্দুয়া পৌর সদরের কমলপুর এলাকায় মাসিক এক হাজার টাকা ভাড়ায় ছোট একটি ঘরে বসবাস করছেন আঃ বারেক।
মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ও চার্জশিট সূত্রে জানা যায়, আঃ বারেক ও মামলার আসামিরা পাশাপাশি বাড়ির বাসিন্দা। জমি-জমা নিয়ে তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এর জেরে বাদী কয়েকজনের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগও করেছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অভিযোগের কারণে আসামিরা বাদী ও তাঁর ভাগ্নে সোহাগের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মাছিয়ালী গ্রামের একটি বাড়িতে সোহাগের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। এজাহারে আঃ বারেক অভিযোগ করেন, আবুল হাসেম, হোসেন, খোকন, হক মিয়া, মামুন, জাকির হোসেনসহ কয়েকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সোহাগের বাড়িতে প্রবেশ করে তাঁকে ঘেরাও করেন। পরে রড ও রামদা দিয়ে সোহাগের মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়।
প্রথম হামলায় আহত সোহাগকে চিকিৎসার জন্য কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে একই দিন সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে দামিনা এলাকায় দ্বিতীয় দফায় হামলার অভিযোগ করেন আঃ বারেক।
চার্জশিটে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, দামিনা এলাকায় আগে থেকে রামদা, লোহার শাবল ও রড নিয়ে অবস্থান করা আবুল হাসেম, হোসেন, খোকন, হক মিয়া, মামুন, জাকির হোসেন ও আবুল কাশেম অটোরিকশার গতিরোধ করেন। এ সময় আবুল হাসেম ও খোকন বাদীকে টানাটানি করে অটোরিকশা থেকে রাস্তায় ফেলে দেন বলে তদন্তে উঠে আসে।
এরপর আবুল হাসেম শাবল দিয়ে আঃ বারেকের মাথায় আঘাত করেন এবং হোসেন ও খোকন রামদা দিয়ে তাঁর দুই পায়ে কোপ দেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে তাঁর হাত ও পায়ে গুরুতর জখম হয় বলে চিকিৎসা সনদে উল্লেখ রয়েছে। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁকে ও সোহাগকে কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে আঃ বারেককে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এজাহারে বসতঘরের টিনের বেড়া ও দরজা ভাঙচুর করে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি এবং ঘর থেকে প্রায় ৪০ হাজার টাকা মূল্যের মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছিল। তবে তদন্তে ভাঙচুরের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়। ঘর থেকে মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় দণ্ডবিধির ৩৮০ ধারায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি। একইভাবে ৪৪৮ ধারার অভিযোগও তদন্তে প্রমাণিত হয়নি বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার এক সপ্তাহ পর ৮ ডিসেম্বর ২০২৩ কেন্দুয়া থানায় মামলা করেন আঃ বারেক। মামলার নম্বর ০৩, তারিখ ০৮/১২/২০২৩ এবং জিআর নম্বর ৩৬০/২০২৩। মামলার তদন্ত শেষে ১৬ মার্চ ২০২৪ কেন্দুয়া থানার এসআই মো. জিয়াউল হক আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
চার্জশিটে আবুল হাসেম, হোসেন, খোকন, হক মিয়া, মামুন, জাকির হোসেন, আবুল কাশেম, কোহিনূর, হোসনা আক্তার ও নিলুফা—এই ১০ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৭, ৩৪১, ৩২৩, ৩২৫, ৩২৬, ৩০৭, ৪২৭, ৫০৬(২) ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে বলে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে আহত আঃ বারেক ও সোহাগের চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা, সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শনের তথ্যও উল্লেখ রয়েছে।
তবে মামলার চার্জশিট দাখিল হলেও তাঁদের নিরাপত্তা ও বসতভিটায় ফেরার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি বলে দাবি আঃ বারেকের। তিনি বলেন, “নিজের বাড়ি ও জমি থাকা সত্ত্বেও প্রায় আড়াই বছর ধরে অন্যের বাড়িতে ভাড়া থাকছি। বাড়িতে গেলেই আমাকে ও আমার স্ত্রীকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। আমরা নিরাপদে নিজেদের বাড়িতে ফিরতে চাই।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বসতভিটায় নির্বিঘ্নে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বিরোধের স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।

