রুয়েট প্রতিনিধি
দীর্ঘ এক যুগ পর রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) উপ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি) পদে নিয়োগ পেয়েছেন পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেন। গত ২৭ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে চার বছরের জন্য তাঁকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামো, আবাসন ও শিক্ষক সংকট নিরসনে নানা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। গবেষণায় গুণগত মান নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত সময়ের আগেই স্নাতক সম্পন্ন করা এবং রুয়েটকে শতভাগ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
অধ্যাপক আখতার হোসেন বলেন, গবেষণার ক্ষেত্রে শুধু প্রকাশনার সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং দেশের বাস্তব সমস্যার সমাধানে কার্যকর গবেষণায় গুরুত্ব দিতে হবে। দেশীয় প্রযুক্তি ও নিজস্ব দক্ষতা কাজে লাগিয়ে গবেষণার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখার ওপর জোর দেন তিনি। এ লক্ষ্যে রুয়েটে ইনকিউবেশন হাব গড়ে তোলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক মুনাফার অন্তত ১০ থেকে ২০ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) খাতে ব্যয় বাধ্যতামূলক করা উচিত। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব চাহিদার সমন্বয় ঘটবে এবং পণ্যের মানোন্নয়নের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।
বিদেশে অবস্থানরত মেধাবীদের দেশে ফেরানোর বিষয়ে তিনি বলেন, টেসলা, নাসা ও গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানে দেশের অনেক মেধাবী কাজ করছেন। তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনতে হলে উপযুক্ত বেতন, চাকরির নিশ্চয়তা, আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও গবেষণার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
রুয়েটে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে প্রো-ভিসি বলেন, ইউজিসির নির্ধারিত বাজেট ও নিয়োগসংক্রান্ত নির্দেশনার মধ্যে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন ও বাস্তবতা তুলে ধরে ইউজিসির সঙ্গে আলোচনা করে সংকট নিরসনের চেষ্টা চলছে।
শিক্ষার্থীদের একাডেমিক অগ্রগতি নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকলে তিন বছর আট মাসের মধ্যে শিক্ষার্থীদের স্নাতক সম্পন্ন করানোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। পাশাপাশি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে শতভাগ কোডিং পদ্ধতি চালুর পক্ষে মত দিয়ে বলেন, এতে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
আবাসন সুবিধার বিষয়ে তিনি জানান, বর্তমানে রুয়েটের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে শতভাগ আবাসন সুবিধা। নতুন কয়েকটি ১০ তলা হল নির্মাণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে শতভাগ আবাসিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ছাত্ররাজনীতি প্রসঙ্গে অধ্যাপক আখতার হোসেন বলেন, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ রয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গোপনে রাজনৈতিক তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তাঁর মতে, ছাত্ররাজনীতি মানে দখলদারত্ব বা লেজুড়বৃত্তি নয়; বরং শিক্ষার্থীদের অধিকার ও সমস্যা নিয়ে কথা বলার সুযোগ। এ বিষয়ে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের চাহিদা ও মতামতের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত।
তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানসহ দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা প্রশংসনীয়। নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ হলেও ২০২৪ সালের পর শিক্ষার্থীদের একাংশের মধ্যে সহনশীলতা ও শালীনতা কমে যাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক। জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অর্জনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “সাহস যেন কখনো দুঃসাহসিকতায় পরিণত না হয়।”

