নোয়াখালী প্রতিনিধি
চোখের সামনে ভাসছে ১৮ মাসের ছোট্ট ফাতেমা আক্তারের মুখ। বাবার শেষ বিদায়ে যখন স্বজন-প্রতিবেশীদের চোখে অশ্রু, তখনও হয়তো বাবাকে হারানোর অর্থ বোঝার বয়স হয়নি তার। সময়ের সঙ্গে একদিন সে বুঝবে, দেশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তার বাবা আর কখনো ফিরে আসেননি। সেই উপলব্ধিই হয়তো হবে তার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতি।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনে ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় আকস্মিক দুর্ঘটনায় নিহত সেনাসদস্য আবু বকর সিদ্দিক ওরফে পিয়াসের শেষ বিদায়ে এমনই শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয় নোয়াখালীর কবিরহাটের মালিপাড়া গ্রামে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জানাজা শেষে সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার দিয়ে তাকে দাফন করা হয়।
নিহত আবু বকর সিদ্দিক পিয়াস কবিরহাট উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মালিপাড়া গ্রামের আব্দুল ওয়াহাবের ছেলে। চার বোনের একমাত্র ছোট ভাই ছিলেন তিনি। শান্ত, ভদ্র ও অমায়িক স্বভাবের কারণে ছোটবেলা থেকেই এলাকায় সবার প্রিয় ছিলেন পিয়াস।
পরিবারের সদস্যরা জানান, চাকরির সুবাদে স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মাকে নিয়ে চট্টগ্রামের সেনা কোয়ার্টারে বসবাস করতেন পিয়াস। দেশের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরিবারকে ঘিরে ছিল তার ছোট্ট সংসার। ১৮ মাস আগে সেই সংসারে আসে কন্যাসন্তান। মেয়েকে ঘিরে পরিবারের আনন্দের মধ্যেই হঠাৎ নেমে আসে শোকের ছায়া।
নিহতের চাচা মোশারেফ হোসেন বলেন, “১৮ মাস আগে পিয়াসের ঘর আলো করে একটি কন্যাসন্তান এসেছিল। মেয়েকে ঘিরে যখন পরিবারের আনন্দ-উচ্ছ্বাস, ঠিক তখনই এলো তার মৃত্যুর খবর। বাবার স্নেহ-ভালোবাসা বোঝার আগেই বাবাকে হারাল সেই শিশু।”
নিহতের ভগ্নিপতি আবু সাঈদ বলেন, পিয়াস ছিলেন চার বোনের একমাত্র ছোট ভাই। ছোটবেলা থেকেই তিনি শান্ত ও সহজ-সরল স্বভাবের ছিলেন। সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন। তার অমায়িক ব্যবহারের কারণে স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছেও তিনি ছিলেন খুবই প্রিয়।
পিয়াসের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মালিপাড়া গ্রামজুড়ে নেমে আসে শোকের আবহ। বৃহস্পতিবার সকালে শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে দেখতে বাড়িতে ছুটে আসেন স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয়রা। পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
স্থানীয় বাসিন্দা এবাদ উল্যাহ বলেন, “পিয়াস খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তার এমন অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, মাত্র ১৮ মাসের একটি মেয়েকে রেখে তাকে চলে যেতে হলো।”
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনের সময় ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের একপর্যায়ে আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে দুই সেনাসদস্য নিহত হন এবং এক সেনা কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন। আহত কর্মকর্তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে করে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
কবিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পূদম পুষ্প চাকমা বলেন, সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার দিয়ে পিয়াসকে দাফন করা হয়েছে। দেশের সেবায় নিয়োজিত একজন তরুণের এভাবে অকালে চলে যাওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার পরিবারকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
সৈনিক আবু বকর সিদ্দিক পিয়াসের আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে।

