ফরিদপুর প্রতিনিধি
জন্মের মাত্র ২১ দিনের মাথায় মাকে হারায় ছোট্ট মুসলিমা ইসলাম। আর দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই জনতার পিটুনিতে নিহত হলেন তার বাবা ট্রাকচালক হান্নান শেখ। ফলে ২৫ মাস বয়সী এই শিশুটি এখন পুরোপুরি এতিম হয়ে পড়েছে। তার একমাত্র ভরসা বৃদ্ধ দাদা-দাদী—যাদের চোখে এখন শোকের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ।
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নের সাতৈর গ্রামে হান্নান শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। বাড়িজুড়ে শোকের মাতম, স্বজনদের আহাজারি। আর সেই ভিড়ের মাঝেই কিছু না বুঝে কখনো দাদীর কোলে, কখনো অন্যের কোলে ঘুরছে ছোট্ট মুসলিমা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মুসলিমার মা আরিফা বেগম তার জন্মের ২১ দিন পর স্বামীকে তালাক দিয়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর থেকে দাদা শাহিদ শেখ ও দাদী নার্গিস বেগমই তাকে লালন-পালন করে আসছেন।
দাদী নার্গিস বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “মা ২১ দিনেই চলে গেছে, এখন বাপও নাই। আমার মুসলিমার কেউ রইল না। আমি মরে গেলে এই বাচ্চার কী হবে?”
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাত ৯টার দিকে নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া এলাকায় দ্রুতগতির একটি ট্রাক কয়েকজন পথচারীকে ধাক্কা দেয়—এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে “ট্রাকটি ২০ জনকে চাপা দিয়েছে” এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়।
পরবর্তীতে স্থানীয়রা ইট-বালু ফেলে রাস্তা অবরোধ করে ট্রাকটি থামায়। চালক হান্নান শেখকে ট্রাক থেকে নামিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় ট্রাকের দুই হেলপার নাঈম (২২) ও আল-আমিন (২৫) আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া স্থানীয় কয়েকজনও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
পরিবারের অভিযোগ, গুজবের জেরে হান্নানকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয়দের একাংশ দাবি করেছেন, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।
এ ঘটনায় সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে ছোট্ট মুসলিমা। মা-বাবাহীন এই শিশুটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা। বৃদ্ধ দাদা-দাদীর পক্ষে কতদিন তার দায়িত্ব বহন করা সম্ভব—তা নিয়েও দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
স্থানীয়দের দাবি, মুসলিমার জন্য জরুরি ভিত্তিতে সরকারি ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা হোক।

