রাসেল আহমেদ, খুলনা প্রতিনিধি
খুলনা অঞ্চলের নারী নেতৃত্বের জাতীয় সংসদে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতায় এবার ব্যতিক্রম ঘটেছে। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি সংসদেই সংরক্ষিত নারী আসনে খুলনার প্রতিনিধিত্ব ছিল। উপকূলীয় এলাকার নারী নেত্রীরা সংসদে গিয়ে দারিদ্র্য, জলবায়ু ঝুঁকি, উন্নয়ন বৈষম্যসহ নানা ইস্যু তুলে ধরেছেন জাতীয় নীতিনির্ধারণে। কিন্তু ৪৭ বছরের সেই ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এসে প্রথমবারের মতো ছেদ পড়েছে।
এবারের সংসদ নির্বাচনে ভালো ফল করলেও সংরক্ষিত নারী আসনে খুলনা অঞ্চল থেকে কোনো নারী নেত্রীকে মনোনয়ন দেয়নি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও নারী নেতৃত্বের মধ্যে হতাশা ও আলোচনা চলছে।
জানা যায়, খুলনা বিভাগের ৩৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি ১১টিতে জয় লাভ করে, যার মধ্যে ৪টি আসন ছিল খুলনা জেলার। এই ফলাফলের পর সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য খুলনা অঞ্চলের একাধিক নারী নেত্রী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। সাবেক সংসদ সদস্যসহ অভিজ্ঞ ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মী থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলটি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে তাদের কাউকেই মনোনয়ন দেয়নি।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টিতে জয় পাওয়া দলটি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব অনুযায়ী চারটি সংরক্ষিত নারী আসনের সুযোগ পেলেও সেখানে খুলনা অঞ্চলের কোনো নারী নেত্রী স্থান পাননি। বরং সিলেট, বগুড়া ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের নারী নেত্রীদের সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংরক্ষিত নারী আসনে খুলনার দীর্ঘদিনের প্রতিনিধিত্ব না থাকা একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। এতে করে উপকূলীয় অঞ্চলের নারী নেতৃত্বের জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণে একটি শূন্যতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, দ্বিতীয় সংসদ থেকে দ্বাদশ সংসদ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে খুলনা অঞ্চলের নারী নেত্রীরা সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সুলতানা জামান চৌধুরী, সৈয়দা নার্গিস আলী, বেগম মন্নুজান সুফিয়ান, নূর আফরোজ আলী, হ্যাপি বড়াল, গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকারসহ একাধিক নারী নেত্রী সংসদে উপকূলীয় এলাকার সমস্যা ও অধিকার আদায়ের বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। তাদের ভূমিকা স্থানীয় উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এবার সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়ায় খুলনার নারী নেতৃত্বের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় নারী সংগঠন ও ব্যবসায়ী মহলও বিষয়টিকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ জাতীয় সংসদে তুলে ধরতে নারী প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যা এবার অনুপস্থিত।
ফোরাম খুলনার সভাপতি সিলভী হারুন বলেন, “উপকূলীয় নারীদের সংগ্রাম ও বাস্তবতা সংসদে আগেও নারী নেত্রীরা তুলে ধরেছেন। এবার সেই সুযোগ না থাকায় আমরা হতাশ।”
খুলনা উইমেন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি শামীমা সুলতানা শীলু বলেন, “নারীদের সমস্যা নারীরাই সবচেয়ে ভালোভাবে সংসদে তুলে ধরতে পারেন। খুলনার প্রতিনিধিত্ব না থাকা উন্নয়ন বৈষম্যের বাস্তবতাকে আবারও সামনে এনেছে।”
মনোনয়নপ্রত্যাশী ও মহানগর বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি সৈয়দা রেহেনা ঈসা বলেন, “খুলনা-বাগেরহাট থেকে নারী প্রতিনিধি থাকলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হতো। সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে এবার সেই সুযোগ হয়নি।”
সব মিলিয়ে দীর্ঘ ৪৭ বছরের সংসদীয় ইতিহাসে খুলনার নারী প্রতিনিধিত্বে এই বিরতি স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

