রাসেল আহমেদ,খুলনা প্রতিনিধি
খুলনায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আধিপত্য, টার্গেট কিলিং ও দফায় দফায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে পুরো জেলাজুড়ে নেমে এসেছে উদ্বেগের ছায়া।
গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে অপরাধচক্রের সংঘবদ্ধ তৎপরতা যেভাবে বেড়েছে, তাতে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক প্রার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
খুলনা মহানগর পুলিশের তথ্য বলছে, গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর গত ১৬ মাসে খুলনায় ঘটেছে ৪৮টি হত্যাকাণ্ড। এর মধ্যে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ২০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। শুধুমাত্র নভেম্বর মাসেই খুন হয়েছেন সাতজন।
সর্বশেষ আদালত এলাকার মতো অতিসংবেদনশীল স্থানে প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডে ভয় আরও গভীর হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় খুলনা পরিণত হচ্ছে ‘ভয় আর অনিশ্চয়তার নগরী’-তে।
খুলনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ভয়াবহ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্যে আমাদের কর্মীরা শুধু নয়, সাধারণ ভোটাররাও আতঙ্কের মধ্যে আছেন। প্রতিদিনই তারা আমাদের কাছে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।”
তার অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে একাধিকবার আলাপ হলেও মাঠের বাস্তবতায় কোনো পরিবর্তন নেই। মঞ্জুর মতে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে বিভিন্ন মহল ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। তাই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা জরুরি।
খুলনা-৩ আসনের প্রার্থী ও মহানগর জামায়াতের আমির প্রফেসর মাহফুজুর রহমানও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “প্রচার-প্রচারণায় গেলে মানুষ প্রথমেই নিরাপত্তার কথা বলেন। দূরবর্তী এলাকায় গেলে আমাদের নিজেদেরও ঝুঁকি থেকে যায়।” তার মতে, কেবল ঘটনার পর ব্যবস্থা নিলে চলবে না—আগেই গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো এবং পেশাদার অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালানো এখন সময়ের দাবি।
এই অবস্থায় খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার জুলফিকার আলী হায়দার জানান, প্রার্থীদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “২০ নভেম্বর থেকে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও প্রার্থীদের জনসংযোগে অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েন করা হয়েছে। প্রার্থীদের বাসভবন, সভাস্থল এবং প্রচারণাকেন্দ্রিক এলাকায় টহল ও সাদা পোশাকের নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।”
তিনি দাবি করেন, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন হয়েছে এবং অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের দায়ীদের দ্রুত গ্রেফতারের আশ্বাসও দেন তিনি।
সরকারি আশ্বাস থাকলেও মাঠপর্যায়ে অস্বস্তি কাটছে না রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মন থেকে। একই মাসে একাধিক হত্যাকাণ্ড, তাও জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়, পরিস্থিতির জটিলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রাজনৈতিক নেতাদের মতে, সমন্বিত বিশেষ অভিযান ছাড়া বড় কোনো সহিংসতা বা সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী হামলা ঠেকানো সম্ভব নয়। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে দেরি হলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি, আস্থা এবং সামগ্রিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে—এমন আশঙ্কাই এখন খুলনার সর্বত্র।

